সদ্যই কেবল তাঁহার কথা মনে পড়ে কী দিবস, কী রজনী, কী পড়ন্ত বৈকাল সে যেন জড়ায়ে ধরিয়াছে মোর সকল খেয়াল ।
চেতনার সকল রন্ধ্রে কতবার তালা লাগাইলাম— প্রাপ্তি হিসাবে জুটিলো কেবল অসহায় কতক রাত আর ধূলিমাখা পিচ্ছিল আর্তনাদ।
বাঁচিয়া থাকার অমোঘ শখ তাঁহাকে প্রায়শই ভুলাইয়া দেয় কিন্তু তাঁর নিষ্পাপ মুখখানির নিকট বাঁচিয়া থাকার আকুতি যখন অতীব নগণ্য হইয়া দাঁড়ায় তখন আর কী’ই বা করার ?
এক কাকডাকা ভোরে তাঁহার একখানি কথা’ কলিজাটা উতলাইয়া দিয়াছিল— ‘বুঝবি আমি না থাকলে বুঝবি’ !
আমি ঢের বুঝিয়াছি, তোর প্রত্যাশার চাইতে অনেক অনেক বেশি ? তুই হয়তো জানিস না মানুষের স্বভাব কখনো বদলায় না ।
মানুষ নামটাই কেবল আমাদের মহান করেছে; ভেতরটা স্বার্থপরতা, প্রবৃত্তিগত দায়, ক্ষমতা, কাম আর নানান রকমের লোভের চাদরে মোড়ানো ।
তোর কত অশ্রু, আর্তনাদ, ছোট্ট একটি সংসারের স্বাভাবিক স্বপ্ন আমার কাছে অতীব যতনে জমা করা আছে যদি পারিস, স্বপ্নগুলো ফেরত নিস ।
আমার কাছে পৃথিবীর কোনো মানে নেই। আমার কাছে জীবনের আলাদা কোনো ভাষা নেই । স্বাদ নেই, স্বস্তি নেই, শাস্তি নেই, শ্রান্তি নেই, তিক্ততা নেই, ক্লেদ নেই, নেই কোনো প্রাপ্তি । সমস্ত নতি স্বীকারের মধ্যে এখনো আমি তোমাকেই খুঁজি পৃথিবীর মানে বলতে এখনো আমি তোমাকেই বুঝি ।
আমি কোনো সংবিধান মানি না। আমি প্রেসিডেন্ট মানি না আমি কোনো প্রধানমন্ত্রী মানি না মন্ত্রীমশাইদের একের পর এক বিরল প্রজাতির আশ্বাস মানি না। সেনাবাহিনীর তাণ্ডব অথবা অভিবাদনের নামে ফুলেল শুভেচ্ছা, ভয়ার্ত চিৎকারে গার্ড অব অনার বিলকুল তাড়িত করেনা আমায় ।
রাষ্ট্রযন্ত্র বিকল করে ক্ষমতায় বসে থাকার পশুবৃত্তি’ মানি না আমি । মানি না ৫৪ ধারা, পুলিশি নির্যাতন । শক্ত বিধান এবং শক্তিশালী মানুষ সব মূল্যহীন, কিছুই মানি না আমি।
আমি সংসদ মানি না, সাংসদ মানি না, ন্যায়-নীতি, নিষ্ঠা, বিনয়াবনতা, সততার চার পয়সার দাম নেই আমার কাছে । তোমার মূল্যেই কেবল ওরা আমার কাছে মূল্যবান অথবা মূল্যহীন, প্রিয়তমা । , ধুরন্ধর গোধূলির স্পষ্ট অস্পষ্টতা আমার গতরে জ্বালা ধরাতে পারে না । হলুদ নদীর আদৌ সাহস নেই আমাকে চুম্বনের, আমাকে ছোঁয়ার । বাঁচা-মরার ধুন্ধুমার কোনো ভিন্নতা নেই আমার কাছে । আলো-আঁধারের ব্যবধান কোথায় আমি বুঝি না, জানি না ।
আমি স্বপ্ন দেখি না, দেখতে পারি না। তুমিহীন সব স্বপ্নই আমার কাছে মিথ্যাচার, দুঃস্বপ্ন, স্বপ্নবিলাস, প্রলয়ঙ্কারি পাপাচার, ব্যভিচার ।
রীতিনীতি, কাল-মহাকাল, আদিম যুগ, স্বর্ণ যুগ, কলি যুগের সাধ্য নেই আমাকে পরাভূত করার; আমার সাথে সখ্যতা গড়ে তোলার ।
আমি সুখ নামের বহুমাত্রিক অসুখকে বুট দিয়ে পিষ্ট করে লাথি মেরে ভারত মহাসাগরে ফেলে দেই । আমি অশ্রুর সফেনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সারারাত অব্দি তোমার ফিরে আসার প্রহর গুনতে থাকি । আমার ধুম্রজালে ভরা খেয়ালকে বারংবার শুশ্রূষা করি, কেবল তোমার জন্য, সুহাসিনী রাজকন্যা ।
অনন্যোপায় এই ধরায় কোনোদিনই ফুটবে না হয়ত আশার বকুল । তবুও সকল অনুবিধি, অনুমত অনুদঘাত, অনুপপত্তি আমার কাছে নির্ভেজাল, বেমালুম উপেক্ষিত ।
সুদখোরদের মতো নিমাইর গচ্ছিত কোনও টাকা নেই । কাম করলে খায়, কাম না করলে–? ১ বউ, ০২ কন্যা আর বুড়ো মাকে নিয়ে ওরা মোট ০৫ পেট । ০৫ পেটের কামাইছুত নিমাই একাই ।
বছর কুড়ি আগে আলীপুর মোড়ে নিমাই তাবিজ বেচত । আয়-রোজগার তখন মন্দ ছিল না ঠাকুরের দোকান থেকে মায়ের জন্য রসগোল্লাও আনা হতো অকস্মাৎ । তাবিজের চল উঠে যাওয়ায় নিমাই বছর কয়েক মাটি কেটেছে কয়েক-বসন্ত রাজমিস্ত্রির জোগালদারও ছিল ।
এতিম নিমাইর জগাই নামে এক ভাই ছিল ৭১ পরবর্তী সময়ে রক্ষীবাহিনীর হাতে ভিটেমাটিসহ জগাইকেও জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে ।
নিমাইর বড় মেয়ে ইলিশে মন্ত্রমুগ্ধ মাছবাজারের চারিপাশে নিমাই চোরের মতো ঘুরে । ইলিশের দর আর নিমাইর লুঙ্গির গোঁজ ভবেরহাটের দুই মেরুর অবস্থান ।
এখন নিমাই অটোভ্যান চালায় মহাজনের জমা দেওয়ার পরও ৩০০/৫০০ থাকে । ভালো খেতে না পারলেও ০৫ পেট চলে যায় । চলে যেতে হয় ।
করোনা বা লকডাউনের জুতসই কোনও সংজ্ঞা নিমাইর জানা নেই। বোধ হওয়ার পর থেকে নিমাইর একটাই মন্ত্র— কামলা দিতে পারলে ০৫ পেট চলবে নয়-তো ?
নিমাই কী ভ্যান চালায় না পেট চালায় তা ওর ভোঁতা মীমাংসায় ছোঁয় না । লকডাউনকালে নিমাই ১০০০ টাকা করে অদ্যাবধি ০৩ বার জরিমানা গুনেছে। নিমাই ক্ষীণ এবং হীন সুরে ম্যাজিস্ট্রেটকে অত্যল্প বোঝাতে চেষ্টা করেছে— করোনা, লকডাউন, মাস্ক, ঘরে থাকা, হাত ধোয়া, গাও ধোয়া সবই অধম মেনে নিবে; শুধু আমার ০৫ পেট ভরে দেবার নিশ্চয়তা দেন। ফলাফলঃ পুলিশের চড়-থাপ্পড়, পাবলিকের ট্যাক্সের টাকায় কেনা সরকারি বুটের পাইকারি লাথি এবং ম্যাজিস্ট্রেটের দস্তখতসহ ১০০০ টাকার জরিমানার স্লিপ ।
হরিপদ নামে নিমাইর এক স্কুল-মাস্টার বন্ধু আছে । হরিপদ নিমাইকে বলেছে— বিদেশে লকডাউনের সময় সরকার ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেয় । নিমাইর সরল কোরাস— গতর থাকতে পরেরটা আমার লাগবে না কিন্তু সরকার উল্টো ৩০০০/= নিয়ে নিলো, কেন ?
০১ জুলাই থেকে তীব্র লকডাউন চলছে দেখা মাত্রই গ্রেফতার ! গ্রেফতারের ডর নিমাই-অবধি পৌঁছানোর সুযোগ নেই ।
ভাবলেশহীন নিমাই ভ্যান নিয়ে বের হয়ে পড়েছে । চুরি-চামারি করে যদি দু-এক খ্যাপ মারা যায় ? কিন্তু আজ আর তা হলো না
পুলিশ এবং আর্মির যৌথ অভিযানে নিমাইকে আটক করা হলো । একই অপরাধ বারবার করায় নিমাইকে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ০৬ মাসের জেল দিয়ে দিলো ।
নিমাইর চোখেমুখে আন্ধার । ০৬ মাস না আমাকে ৬০ বছরের জেল দেন। আমি না আসা পর্যন্ত শুধু আমার বাড়ির ০৪ পেট ভরার ব্যবস্থা করে দেন । পুলিশ আর বসে থাকতে পারল না ? স্যারের সাথে বেয়াদবি ! মুখে মুখে তর্ক ! বানচোদ, শালা মালাউনের বাচ্চা বলতে বলতে এবং সমানে লাথি মারতে মারতে নিমাইকে গাড়িতে উঠিয়ে ফেললেন । নিমাইর অশ্রুকবলিত দুটি চোখে হরেক প্রশ্ন ? না-বলা অভিমানের স্তূপ ?
কমিশনার,ম্যাজিস্ট্রেট, মেয়র, ডিসি, সচিব, চিত্তশালী, বিত্তশালী, রক্ষণশীল, প্রগতিশীল, সুশীল, মোড়ল, কামলা, মাদবার, মৃদুভাষী, স্পষ্টভাষী, মন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং লিঙগহীন আন্দোলনপ্রিয় জনগণ— সবার কাছে নিমাইর অব্যক্ত আবেগের দ্ব্যর্থহীন এবং শর্তহীন প্রশ্ন— আমার অবর্তমানে আমার ০৪ পেটের দায়িত্ব নিবে কে ?