ফাঁসির মঞ্চ থেকে ইমাম সাহেব বলছি । মুহাম্মাদ ইমরান । Fasir Monch Theke Imam Saheb Bolci . Kobi Imran .

ফাঁসির আগে আব্দুল মান্নানের লেখা শেষ চিঠি

প্রিয়তমা খাদিজা

এই চিঠি পাওয়ার পর তুমি একটি বিয়ে করে নিও। আমি অনুমতি দিলাম। আমার মৃত্যুর বাকী আর ৭০ মিনিট  ১৫ সেকেন্ড। আমি ভালো আছি। আমার কোনও দুঃখ নেই। তবে আমাকে ফাঁসি দেওয়ার কারণটা যদি জানতে পারতাম, সেটি আরও ভালো হতো। আমাকে কেন রাজাকার বানিয়ে দেওয়া হলো—প্রাপ্তবয়স্ক এই প্রশ্নের সদুত্তর জানার বড় ইচ্ছে ছিলো। তাই বাধ্যতামূলক আফসোস নিয়েই চলে যেতে হচ্ছে ।

আমি মসজিদে ইমামতি করতাম। যুদ্ধে গেলে মুসল্লিদের কে নামাজ পড়াবে এই ভেবে ভেবে, আমার আর যুদ্ধে যাওয়া হলো না। কিন্তু বিশ্বাস করো—গিয়াস, তপন, করিম মোল্ল্যা, সাত্তারসহ অনেক সশস্ত্র যোদ্ধাই আমার বাড়িতেই রাত্রি যাপন করত। প্রতিদিন রাত্রে ওদের সকলের খাওয়ার ব্যবস্থা আমিই করতাম। তপন ও গিয়াসের বাড়িতে পাকবাহিনী দুই দুইবার হামলা করেছে, দুইবারই আমি তপন ও গিয়াসের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছি। উর্দুতে কথা বলে আমি নিজেকে উজাড় করে দিয়ে তপন ও গিয়াসের পুরো পরিবারকে রক্ষা করেছি। আমার বাড়িতে গোপনে মুক্তিসেনাদের থাকা-খাওয়ার বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিবার লক্ষ্যে–আমাকে বেধে, পুরুষাঙ্গে বাটখারা ঝুলিয়ে, চান্দু খুনকার পাক আর্মিদের সাথে নিয়ে আমার ছোট বোনকে তুলে নিয়ে যায়। পরের দিন বস্তাবন্দী ফাতেমার বিবস্ত্র ও বিক্ষিপ্ত লাশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সেই চান্দু খুনকার এখন মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় । আশ্চর্য বিষয় হলো, চান্দু খুনকারই আমাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং অতি অলৌকিক ঘটনা হলো—যার পুরো পরিবারকে আমি রক্ষা করেছিলাম সেই গিয়াস আমার বিরুদ্ধে খুন ও ধর্ষণের অভিযোগের সাক্ষী দিয়েছে । জজ সাহেব আমাকে জিগ্যেস করেছে আপনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য কী না—আমি চান্দু খুনকার আর গিয়াসের চোখের দিকে তাক করে বলেছি, সব সত্য । পৃথিবীতে যত খুন ও ধর্ষণ হয়েছে—সব আমি একাই করেছি ।

যদিও প্রচণ্ড ঘৃণা আর অভিমান থেকে আমি বলেছি ‘সত্য’ তবে অভিযোগ অস্বীকার করলেও রায়ের কোনও পরিবর্তন হতো না। রায়, জজ সাহেব আগে থেকেই লিখে নিয়ে আসছে। পাক আর্মিদের নারী সাপ্লাই দেওয়া চান্দু খুনকার যদি আমাকে রাজাকারের খেতাব দেয়, সেখানে আমার সত্য-মিথ্যা দিয়ে আর কীই-বা হবে বলো ?    

বাস্তবতা আমি মেনে নিয়েছি। আমার হাতে বেশি সময় নেই। তোমাকে অভাব, অনটন আর অভিযোগ ছাড়া আমি কিছু দিতে পারি নি। আমাকে ক্ষমা ভিক্ষা দিও। মার কথা একটু বেশি মনে পড়ছে। তার ছেলের ফাঁসি ! মা এটা কীভাবে মেনে নিবে ? এসব ভেবে আমার মাথা ক্রমশ নত হয়ে আসছে । তুমি বিয়ে করার পর আমার মাকে তোমার সাথে রেখো। এটা আমার আদেশ ।

আমার একটা মাত্র মেয়ের জন্যও কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। ব্যাপারটা দুঃখজনক। আমার টাকাপয়সা নেই। আমার মূলধন ছিল সততা। সেটিও বিক্রি হয়ে গেলো। সবাইকে তুমি দায়িত্ব নিয়ে বলো—আমি মান্নান, যুদ্ধাপরাধী নই। আমার বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা অভিযোগকে সত্য বলা ছাড়া আমি জীবনে একটা মিথ্যা কথাও বলি নি। খুন তো দূরের কথা আমি জীবনে কাউকে একটা চড়-থাপ্পড়ও দেইনি। ধর্ষণের অপবাদটা আমাকে আলাদাভাবে ব্যথিত করে তুলছে। খাদিজা তুমি তো ভালো করেই জানো, মেয়ে মানুষ দেখলে আমি মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতাম। সেই আমাকেই।

১০ ফুট বাই ৬ ফুটের এই কনডেমড সেলে থাকতে থাকতে কেমন যেন আমি প্রতিবন্ধীর মতো হয়ে গেছি। ফাঁসিতে ঝুলে পড়াটাই এই মুহূর্তে আমার কাঙ্খিত জয়ের সমান। জীবন, বেঁচে থাকা, নির্মোহ মমতা—কোনও কিছুকেই আমার আর নিজের বলে মনে হচ্ছে না। কেবল আসন্ন মৃত্যুকেই মনে হচ্ছে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি ।

তোমার মান্নান  

মুহাম্মাদ ইমরান

৮ ৯ ২৬

৭ নং সেক্টর থেকে আজাদ | মুহাম্মাদ ইমরান | জগৎশ্রেষ্ঠ এক পত্র | 7 No. Sector Theke Azad | Kobi Muhammad Imran |

kobi imran.muhammad imran,

৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে যুদ্ধক্যাম্পে যোগ দেওয়া মায়ের কাছে লেখা আজাদের একখানা চিঠি ।

মা

আমার উপর রাগ করো না। এই প্রথম তোমার অবাধ্য হলাম। তোমাকে বললে আমাকে তুমি যুদ্ধক্যাম্পে আসতে দিতে না তাই তোমাকে বলার সাহস পাইনি। গতকাল আতিকের মাকে পাকিস্তানি হানাদাররা তাদের ক্যাম্পে তুলে নিয়ে গেছে। তুমিই বলো মা, এই খবর শোনার পর আমি কী ঘরে বসে থাকতে পারি ? আমার এই দেশটা কী আমার মা নয় ? হয়ত তাঁকে মা বলে ডাকার সৌভাগ্য আমার হয় না কিন্তু তাই বলে কী আমার অনুভূতিতে তাঁর মমত্ব প্রবাহিত হয় না ! তুমিই বলো মা, তোমার ওপর কেউ আঘাত হানলে আমি কী ঘরে বসে থাকতে পারি ?


আমি ০৭ নং সেক্টরের অধিনস্থ আছি। সারা দিন ঘুরে ঘুরে আমি হানাদারদের অবস্থান নিশ্চিত করি এবং সেই খবর আমাদের ক্যাম্পে পৌঁছে দেই’ অতঃপর আক্রমণ। আমার মনটা একটু খারাপ। গতকাল আমার সহযোদ্ধা আরিফকে পাকিস্তানি হানাদারা মেরে ফেলেছে। মা, রাইফেল যে এত ওজন, আমি জানতাম না। রাইফেল বইতে বইতে আমার কাঁধে ঘা হয়ে গেছে; না মা’  আমার ঘায়ে যদি পোকাও পড়ে তারপরও আমার মাকে উদ্ধার না করে আমি তোমার কাছে ফিরব না ।

বাবার জন্য অনেক খারাপ লাগছে। প্রতিদিন ঘুমাবার আগে বাবা আমার দুই গালে চুমু দিয়ে যেত। এখন বাবা কী করে আমি জানি না। আমাকে ডাক্তার বানানোর জন্য বাবার অবিরাম প্রচেষ্টার কী হবে তাও বোধ করি আমি জানি না। আমি জানি মা, তোমরা কিছুতেই আমার বিষয়টা মেনে নিতে পারছ না। আমি জানি, এখানে আমার বেঁচে থাকার চাইতে মরে যাওয়ার সম্ভাবনা ঢের কিন্তু বিশ্বাস করো মা, আমি ভালো আছি। দেশ নামক মা’টার জন্য কিছু করতে পারছি, কী এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে বিহবল হয়ে আছি তা তোমাকে এই ছোট পরিসরে বোঝাতে পারব না। হানাদারদের মোকাবেলা যখন করি তখন শুধু একটা কথাই ভাবি—ওপরে আমার জন্য জান্নাত আর নিচে আমার মা। এই বোধের বাইরে অন্য কোনো বোধ এখনও আমার হৃদয় গহীনে বাসা বাঁধতে পারেনি ।

শিউলির খবর কী, মা ? আমার ইচ্ছা ছিল, একটা ভালো ছেলের সাথে শিউলির বিয়ে দেওয়ার। একটা ভালো ছেলে আমার পছন্দেরও আছে। না থাক, এখন বলব না। আল্লাহ্ যদি বাঁচিয়ে রাখে তবে তারপর। আমি যখন দরজার কপাট খুলে বের হই তখন আনুমানিক রাত ০৩ টা বাজে। লুনা, আমার দুই সন্তান মিতু, নিতু কিছুই টের পাইনি। অনেকটা চোরের মতোই বের হয়েছিলাম। মিতু আগের রাতে খুব করে একটা জামা কিনে দেওয়ার বায়না ধরেছিল, পরের দিন কিনে দেওয়ার কথা বলে ওকে ঘুম পাড়িয়েছিলাম। পারলে তুমি আমার মেয়েটাকে একটা জামা কিনে দিও।

মা তোমাকে যে আমি এত ভালোবাসি তা আমি আগে টের পাইনি। ক্যাম্পে আসার সময় আমার কেবলই মনে হয়েছে, পেছন থেকে কে যেন আমাকে বাজান বাজান’ বলে চিৎকার করছে। না মা’ আমি একটি বারের জন্যও পেছনে তাকাইনি। মা তোমাকে বাস্তববাদী হতে হবে। আল্লাহ্‌প্রদত্ত নাড়ির টানকে কুরবান করতে হবে, আমাদের আর একটা অশরীরী মায়ের জন্য।

সত্যি কথা বলতে কী’ মা, আমার জীবিত ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। তারপরও আল্লাহ্ যদি আমাকে বাঁচিয়ে রাখে, দেখা হবে পাক-হায়েনামুক্ত খোলা আকাশের নিচে । স্বপ্নের স্বপ্নিল আরাধনায়। নতুন এক বেশে । স্বাধীন পতাকার নিচে আমরা সবাই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে ধরে থাকব ।

লুনাকে নিয়ে আমি তেমন কিছু বলব না । তুমি যদি পারো ওকে একটু বুঝিয়ে বলো। আমার সন্তান দুইটিকে তুমি দেখে রেখো। আবারও তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আল্লাহ্ যদি বাঁচিয়ে রাখে দেখা হবে বিজয়ে ।

তোমার বাজান

পুনশ্চঃ না। আজাদ আর কখনোই ফিরে আসেনি। হানাদারমুক্ত স্বাধীন বাংলা তাঁর আর দেখা হয়নি। খবরটা শোনার পর তাঁর মা ০৭ দিন বেঁচেছিল, অতঃপর। আজাদ শহীদ হওয়ার আগে একাই বেশ কিছু পাকিস্তানি হানাদার মেরে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। তারই পরিণামে আজাদের বাড়িতে হানাদাররা পৈশাচিক আক্রমণ চালায়। আজাদের বৃদ্ধ বাবাকে গাছের সাথে ঝুলিয়ে বিবস্ত্র  করে ফাঁসি দিয়ে মেরে ফেলা হয়। আজাদের দুই সন্তানকে বুটের নিচে পিষ্ট করে হত্যা করা হয় এবং আজাদের বোন শিউলি ও স্ত্রী লুনাকে হানাদাররা তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পরের দিন তাদের নিতম্বের মধ্য দিয়ে বাঁশ ঢুকিয়ে গাল দিয়ে বের করা ক্ষত-বিক্ষত লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায় নদীর ধারে ।

ওপরের সব চরিত্রই প্রতীকী হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে কিন্তু স্বাধীন বাংলার পেছনের ইতিহাস এর চাইতেও ঢের করুণ । হাজারো আজাদ, হাজারো বাবা-মার চোখের জলের বিদীর্ণ পথ পেরিয়ে, লক্ষ শিউলি আর লুনার সম্ভ্রমের দামে কেনা আমার এই স্বাধীন বাংলা। এত মহানুভবতা, এত আবেগের জলাঞ্জলি, এত রক্তের দামে কেনা এই স্বাধীন বাংলাদেশ, আমরা যারা এখনও পরাধীন করে রেখেছি কব্জির জোরে অথবা নিজের স্বার্থের তিয়াসা মেটানোর জন্য—আমরা মোটেও হানাদারদের চরিত্রের বাইরের কোনো চরিত্র আজ অবধি হতে পারিনি ।

১১ ০১ ১৬