৭ নং সেক্টর থেকে আজাদ | মুহাম্মাদ ইমরান | জগৎশ্রেষ্ঠ এক পত্র | 7 No. Sector Theke Azad | Kobi Muhammad Imran |

kobi imran.muhammad imran,

৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে যুদ্ধক্যাম্পে যোগ দেওয়া মায়ের কাছে লেখা আজাদের একখানা চিঠি ।

মা

আমার উপর রাগ করো না। এই প্রথম তোমার অবাধ্য হলাম। তোমাকে বললে আমাকে তুমি যুদ্ধক্যাম্পে আসতে দিতে না তাই তোমাকে বলার সাহস পাইনি। গতকাল আতিকের মাকে পাকিস্তানি হানাদাররা তাদের ক্যাম্পে তুলে নিয়ে গেছে। তুমিই বলো মা, এই খবর শোনার পর আমি কী ঘরে বসে থাকতে পারি ? আমার এই দেশটা কী আমার মা নয় ? হয়ত তাঁকে মা বলে ডাকার সৌভাগ্য আমার হয় না কিন্তু তাই বলে কী আমার অনুভূতিতে তাঁর মমত্ব প্রবাহিত হয় না ! তুমিই বলো মা, তোমার ওপর কেউ আঘাত হানলে আমি কী ঘরে বসে থাকতে পারি ?


আমি ০৭ নং সেক্টরের অধিনস্থ আছি। সারা দিন ঘুরে ঘুরে আমি হানাদারদের অবস্থান নিশ্চিত করি এবং সেই খবর আমাদের ক্যাম্পে পৌঁছে দেই’ অতঃপর আক্রমণ। আমার মনটা একটু খারাপ। গতকাল আমার সহযোদ্ধা আরিফকে পাকিস্তানি হানাদারা মেরে ফেলেছে। মা, রাইফেল যে এত ওজন, আমি জানতাম না। রাইফেল বইতে বইতে আমার কাঁধে ঘা হয়ে গেছে; না মা’  আমার ঘায়ে যদি পোকাও পড়ে তারপরও আমার মাকে উদ্ধার না করে আমি তোমার কাছে ফিরব না ।

বাবার জন্য অনেক খারাপ লাগছে। প্রতিদিন ঘুমাবার আগে বাবা আমার দুই গালে চুমু দিয়ে যেত। এখন বাবা কী করে আমি জানি না। আমাকে ডাক্তার বানানোর জন্য বাবার অবিরাম প্রচেষ্টার কী হবে তাও বোধ করি আমি জানি না। আমি জানি মা, তোমরা কিছুতেই আমার বিষয়টা মেনে নিতে পারছ না। আমি জানি, এখানে আমার বেঁচে থাকার চাইতে মরে যাওয়ার সম্ভাবনা ঢের কিন্তু বিশ্বাস করো মা, আমি ভালো আছি। দেশ নামক মা’টার জন্য কিছু করতে পারছি, কী এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে বিহবল হয়ে আছি তা তোমাকে এই ছোট পরিসরে বোঝাতে পারব না। হানাদারদের মোকাবেলা যখন করি তখন শুধু একটা কথাই ভাবি—ওপরে আমার জন্য জান্নাত আর নিচে আমার মা। এই বোধের বাইরে অন্য কোনো বোধ এখনও আমার হৃদয় গহীনে বাসা বাঁধতে পারেনি ।

শিউলির খবর কী, মা ? আমার ইচ্ছা ছিল, একটা ভালো ছেলের সাথে শিউলির বিয়ে দেওয়ার। একটা ভালো ছেলে আমার পছন্দেরও আছে। না থাক, এখন বলব না। আল্লাহ্ যদি বাঁচিয়ে রাখে তবে তারপর। আমি যখন দরজার কপাট খুলে বের হই তখন আনুমানিক রাত ০৩ টা বাজে। লুনা, আমার দুই সন্তান মিতু, নিতু কিছুই টের পাইনি। অনেকটা চোরের মতোই বের হয়েছিলাম। মিতু আগের রাতে খুব করে একটা জামা কিনে দেওয়ার বায়না ধরেছিল, পরের দিন কিনে দেওয়ার কথা বলে ওকে ঘুম পাড়িয়েছিলাম। পারলে তুমি আমার মেয়েটাকে একটা জামা কিনে দিও।

মা তোমাকে যে আমি এত ভালোবাসি তা আমি আগে টের পাইনি। ক্যাম্পে আসার সময় আমার কেবলই মনে হয়েছে, পেছন থেকে কে যেন আমাকে বাজান বাজান’ বলে চিৎকার করছে। না মা’ আমি একটি বারের জন্যও পেছনে তাকাইনি। মা তোমাকে বাস্তববাদী হতে হবে। আল্লাহ্‌প্রদত্ত নাড়ির টানকে কুরবান করতে হবে, আমাদের আর একটা অশরীরী মায়ের জন্য।

সত্যি কথা বলতে কী’ মা, আমার জীবিত ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। তারপরও আল্লাহ্ যদি আমাকে বাঁচিয়ে রাখে, দেখা হবে পাক-হায়েনামুক্ত খোলা আকাশের নিচে । স্বপ্নের স্বপ্নিল আরাধনায়। নতুন এক বেশে । স্বাধীন পতাকার নিচে আমরা সবাই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে ধরে থাকব ।

লুনাকে নিয়ে আমি তেমন কিছু বলব না । তুমি যদি পারো ওকে একটু বুঝিয়ে বলো। আমার সন্তান দুইটিকে তুমি দেখে রেখো। আবারও তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আল্লাহ্ যদি বাঁচিয়ে রাখে দেখা হবে বিজয়ে ।

তোমার বাজান

পুনশ্চঃ না। আজাদ আর কখনোই ফিরে আসেনি। হানাদারমুক্ত স্বাধীন বাংলা তাঁর আর দেখা হয়নি। খবরটা শোনার পর তাঁর মা ০৭ দিন বেঁচেছিল, অতঃপর। আজাদ শহীদ হওয়ার আগে একাই বেশ কিছু পাকিস্তানি হানাদার মেরে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। তারই পরিণামে আজাদের বাড়িতে হানাদাররা পৈশাচিক আক্রমণ চালায়। আজাদের বৃদ্ধ বাবাকে গাছের সাথে ঝুলিয়ে বিবস্ত্র  করে ফাঁসি দিয়ে মেরে ফেলা হয়। আজাদের দুই সন্তানকে বুটের নিচে পিষ্ট করে হত্যা করা হয় এবং আজাদের বোন শিউলি ও স্ত্রী লুনাকে হানাদাররা তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পরের দিন তাদের নিতম্বের মধ্য দিয়ে বাঁশ ঢুকিয়ে গাল দিয়ে বের করা ক্ষত-বিক্ষত লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায় নদীর ধারে ।

ওপরের সব চরিত্রই প্রতীকী হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে কিন্তু স্বাধীন বাংলার পেছনের ইতিহাস এর চাইতেও ঢের করুণ । হাজারো আজাদ, হাজারো বাবা-মার চোখের জলের বিদীর্ণ পথ পেরিয়ে, লক্ষ শিউলি আর লুনার সম্ভ্রমের দামে কেনা আমার এই স্বাধীন বাংলা। এত মহানুভবতা, এত আবেগের জলাঞ্জলি, এত রক্তের দামে কেনা এই স্বাধীন বাংলাদেশ, আমরা যারা এখনও পরাধীন করে রেখেছি কব্জির জোরে অথবা নিজের স্বার্থের তিয়াসা মেটানোর জন্য—আমরা মোটেও হানাদারদের চরিত্রের বাইরের কোনো চরিত্র আজ অবধি হতে পারিনি ।

১১ ০১ ১৬

এবার  তবে মুক্তি দাও | মুহাম্মাদ ইমরানের কবিতা | Ebar Tobe Mukti Dao | Muhammad Imran |

অনেক হয়েছে। এবার মুক্তি দাও।
অনেক সয়েছি। এবার ছেড়ে দাও ।
হুম, আমি জানি আমি ভুল করেছি।
ভুল অমানুষকে ভালোবেসে
ভুল আত্মাকে কাছে টেনে ।

না না’ আমার কোনো  আপত্তি নেই।
আমার কখনো কেউ ছিল না
এখনো কেউ নেই ।
তোমাদের এই রঙ্গমঞ্চের
আলাদা একটা ভাষা আছে
তোমাদের যাপিত সমাজ ব্যবস্থার
অভিন্ন একটা রূপ আছে ।

রূপটা স্বার্থের তাগাদা পূরণের
হাসিমুখে অনর্গল মিথ্যা বলার
গরীবের পয়সা চুষে নেওয়ার
নিশিদিন ভালো মানুষের অভিনয় করার ।

তোমাদের চরিত্রের বাইরে
আরও একটি চরিত্র বিদ্যমান;
কাম তার নাম অথবা যৌনতা
শাড়ির মাঝে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার
স্বতঃস্ফূর্ত প্রবণতা নচেৎ মদ্যপান ।

মানতে কোন বাধা নেই, তোমরা যোদ্ধাজাতি
তোমরা বীর, বীর মুক্তিযোদ্ধা ।
জীবন্মৃত সব বাঙলা প্রাণীর হুঙ্কার
তোমরা ১৬ কোটি বাঙালির দম্ভোক্তি
আত্মিক প্রশান্তি, চূড়ান্ত অহঙ্কার ।

আবার তোমরা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাও
মাসিক ভাতা খাও
তাকবিরুল্লাহর সহিত
০৫ ওয়াক্ত নামাজও পড়ো  
কথায় কথায় ৭১ এ ফিরে যাও ।

মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও
হয়েছ তুমি আগুয়ান
হানাদার ধ্বংস করতে
তুমি পিছপা হওনি মোটেও
অকুতভয় জাওয়ান ।
রাইফেল বইবার ক্ষত
এখনও তোমার কাঁধে অক্ষত ।

বানিয়ে বানিয়ে কী সুন্দর গল্প সাজাও
দাদীমার রূপকথার ঝুলিকেও হার মানাও ।
বাটপারও তোমার কাছে মেনেছে হার
৩০% কোটা ছাড়া কী হতো না তোমার ?
ওহে ভণ্ড, গর্বিত জানোয়ার
কোন ভূষণে সাজবে তুমি
কোন কাফনে বাঁধবে তুমি
জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, বীর কুলাঙ্গার ।

ও’ দুবাই ফেরত কম্বলওয়ালা !
দেখা হয়েছি কী কখনো
চাঁদের নিচে লুকানো
টার্মিনালে কুচিমুচি হয়ে
শুয়ে থাকা বুড়ির’ থর থর কাঁপন
দেখা হয়নি বুঝি, টুকাই আর কুকুরের
গলাগলি ধরি, অভিশাপের
রাত শেষ না হওয়ার রাত্রি যাপন ।

পার্থক্য কোথায় জানতে চাই
তাঁরা কী তোমাদের থেকে
আলাদা কিছু ভাই ।
হুম ! তাঁরাও মানুষ তবে শুধু দেখতে
সাহিত্যিকের ভাবনা জুড়ে
পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠা ভরে
কোটিপতির ০৬ তলার পরে
দৃষ্টিকটু একটি ছোট
ছোনের ঘরের তরে ।

অনেক তো হলো এবার দাও যেতে  
এত সংক্ষিপ্ত পরিসরে
কেবলই নিজকে নিয়ে
পড়ে থাকার কলেবরে
কী চাও অভাগার দল খামাখা
দৃষ্টি জুড়ে তোমাদের টিআর,
রিলিফের চাল আর কাবিখা ।

তোমাদের কী অসুখ করে না, তোমরা কী মৃত্যুহীন প্রাণ ?   
রোজ হাশরের ময়দানে দাঁড়াবে না তুমি, সন্মুখ রহমান ?


১৯ ১০ ১৬

আমার একটা বদভ্যাস আছে | মুহাম্মাদ ইমরানের কবিতা | Amar Ekta Bodovvas Ache | Muhammd Imran |

আমার একটা ভয়ংকর বদভ্যাস আছে
দুপুর এলেই আমি
এলিয়ে দুলিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।

কিন্তু আজ ঘুম নামক ছলনার প্রশান্তি
তার সহজাত তাণ্ডব চালাতে পারেনি
নির্লজ্জ, বেহায়ার মতো বহুক্ষণ
আমি অবাক হয়ে বসে ছিলাম !

অনেক ক্ষমতা তোমার, না !
কী করতে পারো তুমি ?
অকর্মা, অথর্ব, হতচ্ছাড়া
কোনো বেকারকে
ভুল করে একটা ভুল স্বপ্ন
দেখাতে পেরেছ ?

সবুজ-অবুঝ, ন্যায়ের বাণে,
অন্যায়ের তোপে
তোমাকে কোথাও পাওয়া যায় না ।

সৃষ্টি, দৃষ্টি, বৃষ্টি, অনাচার, অত্যাচার,
হত্যায়, লোভে, ক্রোধে, ভুলের ভুলে,
গরিমায়, গৌরবে, ত্যাগে—
কোথায় আছ তুমি, বলো তো দেখি ?

সূর্যের আলো দেওয়া কী বন্ধ হয়ে গেছে ?
চাঁদের অল্পস্বল্প আলোর মূর্ছনায়
নবদম্পতির নয়নাভিরাম
মাদকাসক্ত ঢলাঢলি কী থমকে গেছে ?

কই খুনোখুনি তো বন্ধ করতে পারোনি
এমনকি চুরুটের শেষ টানের সুখটা
পর্যন্ত রুখতে পারো নি,
শুধু পেরেছ, আমার মতো একটা
নির্ভেজাল অপদার্থর সাথে ।


১৯ ০৪ ১৬

অনিমেষের ছাড়পত্র | মুহাম্মাদ ইমরান | শতাব্দীসেরা চিঠি | Animesher Charpotro | Muhammad Imran |

জয়ন্তী চট্টোপাধ্যায়ের কাছে প্রবাসী অনিমেষ বাবুর আকাশের ঠিকানায় লিখা রক্তস্নাত একখানা ছাড়পত্র ।

লক্ষ্মী আমার,

ইদানীং মৃত্যুকে নিয়ে আমার বিশেষ আগ্রহ । যদিও জীবনবাদী ও সুবিধাবাদী এই মানুষটার কাছে মৃত্যুচিন্তা একেবারে নস্যি । তারপরও কেন-জানি মৃত্যুর পরবর্তী জীবনটার প্রতি এক ধরনের  শ্রদ্ধা, দায়বদ্ধতা ও সুখানুভূতি তৈরি হয়েছে আমার ।

কেবলই মনে হয় তোমার আর আমার মাঝে যে মানবপ্রাচীর বিদ্যমান তার দৃশ্যমান ব্যবধান ঘোচানোর জন্য মরণোত্তর জীবনের ভাবনাটাকে কিঞ্চিৎ প্রাধান্য দেওয়া একান্ত আবশ্যক বৈকি ।

বেশ কিছুদিন পূর্বে কার কাছে যেন শুনেছিলাম, তুমি স্বামী-সন্তান নিয়ে বেশ ভালো আছ । কাড়ি কাড়ি টাকা, গাড়ি-বাড়ি, বাহ্যিক আর বৈষয়িক ভালো থাকাটা এখনো যে তোমাকে আগের মতোই আহ্লাদিত করে তা শুনে কিছুটা আহত হয়েছিলাম বটে কিন্তু তোমার ভালো থাকার খবরটা অনেক বেশি শক্তিবর্ধক ছিলো প্রাণহীন এই মানুষটার কাছে ।

হঠাৎ করেই যদি আমি একটি পা’ হারিয়ে ফেলি’ এমনি করেই কী তুমি আমাকে ভালোবাসবে ? খানিকটা হেঁয়ালির ছলে এই প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েছিলাম তোমাকে—উত্তরে তুমি কিছুই বলতে পারছিলে না । আমার মুখ তোমার সব শক্তি দিয়ে চেপে ধরেছিলে আর সমানে কাঁদছিলে । তোমার অশ্রর সাতকাহন সেদিন আমার বুঝা হয়ে ওঠেনি । অশ্র বিসর্জন কতটা সহজ, কতটা মূল্যহীন এবং কতটা নান্দনিক তা বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছি আমি এখন ।

গোসসা করে একবার তুমি টানা চার ঘণ্টা ঝড়বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলে আর অশ্রর সখ্যতায় থর থর করে কাঁপছিলে, তোমার সেই কাঁপন এখনো অহর্নিশ রাত-বিরাতে আমাকে দাবড়ে বেড়ায় । যৎসামান্য পা’ কেটে গিয়েছিলো একবার আমার; খবরটা শুনে, পারলে তোমার একটা পা’ই দিয়ে দাও আমায় । লক্ষ্মী আমার, এত মমতার ছড়াছড়ি—কোথায় পাবো  আমি আবার ।

তোমাকে জানিয়ে রাখি, আমি বিয়ে করেছিলাম । ভদ্রমহিলাকে আমি তেমন কিছু দিতে পারিনি । আসলে আমার দেওয়ার মতো  কিছু ছিল না । প্রেমে পড়া কী  অথবা প্রেমে পড়লে কী হয় তা বোধ করি আজ অবধি ভালোভাবে জানি না আমি ।একবার তোমার ভীষণ জ্বর হয়েছিল, আমি বারবার নিজের মাথায় হাত দিতে লাগলাম, না দেখলাম আমি ঠিক আছি কিন্তু আমার পা’ মাটিতে এলোমেলোভাবে পড়ছিল বোধ হয় । ছোটবেলা থেকেই আমি নিষ্ঠুর প্রকৃতির স্বার্থপর; কালক্ষেপণ না করেই অথবা তোমার কথা না ভেবেই সদর হাসপাতালে চলে গেলাম । ডাক্তার আমাকে বলল, আপনি  হাঁটছেন কীভাবে, আপনার তো ১০৪ জ্বর ! আমি বললাম না স্যার, আমার শরীর তো ঠাণ্ডা, শীতল । তখন ডাক্তার আমাকে বললেন, আপনি মানসিকভাবে  অসুস্থ । ডাক্তারের এই সার্টিফিকেটের পরে, প্রেমের কিছু সংজ্ঞা আমি আবিষ্কার করেছিলাম যদিও তা এখনো খোলসে বন্দী এবং অস্পষ্ট কোনো  ধ্রবতারা ।

আমার জন্মের আগেই বাবাকে হারিয়েছি । কিছু বুঝে উঠার আগেই মাকেও হারালাম । না’  কোনো আশ্রয়, কোনো সান্ত্বনা, সস্তা কোনো  করুণা আমার কপালে জোটেনি । পথ, পথের ধুলা, জীবন এবং জীবিকা—এর মধ্যেই আমার সকল সীমাবদ্ধতা আজ অবধি বন্দী । লেখাপড়ার অদম্য আকুতির কারণে ভাতের হোটেলে চারবছর মেসিয়ারের কাজ করেছি । একটু বড় হবার পর মানুষের বাড়িতে জায়গির থাকতাম । বেঁচে থাকার সুখ কী  অথবা প্রাপ্তি কী, আমি আসলে বুঝতাম না তখন । এরপর তুমি এলে । বিধাতা পরম মমতায় তোমাকে আমায় দান করলো । দখিনা বাতাসে যেইদিন আমি তোমার কোলে মাথা রাখলাম; সেইদিন আমার বোধেও আসলো—আমিও অন্য মানুষের মতো একজন মানুষ ।

বিধাতার সুচারু নিয়মের আবশ্যিক বলয়ে মানুষের প্রেম বিকেন্দ্রীকরণ হয়ে যায় । বাবা-মা, ভাইবোন, প্রেমিক-প্রেমিকা অথবা সব রকমের আপনজনের জন্য মানুষের এহেন ভালোবাসা, আবেগের প্রচণ্ডতা, সত্তাগত  দায়বদ্ধতা  অভিন্ন আঙ্গিকে ভিন্নরুপে প্রদর্শিত হতে থাকে । আপনজন বলতে এই ধরণি তলে  আমার কেউ ছিল না । সুতরাং আমার মধ্যে যা আছে, তার সর্বস্ব নিংড়ে দিয়ে আমি তোমাকে আঁকড়ে ধরেছিলাম । হয়ত পৃথিবীর অদ্ভুত কিছু জটিল সমীকরণে তা আমি ধরে রাখতে পারিনি  কিন্তু তাতে এই অধমের কিচ্ছু যায়-আসে না । জগতের কিছু তাত্ত্বিক, আত্মিক এবং তান্ত্রিক জটিলতায় আমি তোমায় আমার করে রাখতে পারিনি সত্য কিন্তু আমার রক্ত ! আমার রক্তকে যেমন আমি অস্বীকার করতে পারি না; ঠিক তেমনি তোমার সশরীরই কিংবা অশরীরী অস্তিত্ব ধুয়ে-মুছে ফেলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
তোমার সাথে এক বিছানায় ঘুমাতে পারিনি অথবা একই ছাদের নিচে রাজ্যের সব বিশ্বাসকে পুঁজি করে ঘন ঘন অভিমানের খেলায় মেতে উঠে তোমায় আত্মিক প্রশান্তি এনে দিতে পারিনি অথবা যান্ত্রিক এই ধরণি তলে পারিনি যন্ত্রের মতো স্বামী-স্ত্রীর অনিন্দ্যসুন্দর, নয়নাভিরাম অধিকারগুলোকে বাস্তবে রূপায়ণ  করতে । লক্ষ্মী, সশরীরে অথবা সরাসরি কাছে পেতে হবে, তোমাকে আমার কাম-বাসনার সঙ্গী হতে হবে অথবা তোমার স্যাঁতসেঁতে আঁচল দিয়ে আমার মুখ মুছে দিতে হবে নইলে তুমি আমার নও, এমন কোনো কথা আমি অন্তত মানি না । 

আমার থেকে তোমাকে বাদ দেওয়া হলে, আমার অবশিষ্ট কিছু থাকে, তুমি বলো ? এই তো আর মাত্র কয়েকটা দিন । তারপর মৃত্যুর ধূসর সুন্দর, অনন্ত জগৎ । তারপর তুমি-আমি, আমি-তুমি । ময়না আমার, তোমার সব ছবি আমি পুড়িয়ে ফেলেছি । ওটার আমার কোনো  দরকার নেই। আমি তোমাকে এমনিতেই ঢের দেখি । সোনামানিক, জান, লক্ষ্মী আমার—তুমি ভালো থেকো, অনেক, অনেক ভালো ।

ইতি—
তোমার অনিমেষ