বাবা মানে—বাজান, খোকা, খোলা আকাশ একটা মানবের অভিন্ন বোধের দ্বৈত প্রকাশ । বাবা মানে—সম্পদ, বটবৃক্ষ, ক্রমাগত আবদার অনধিকার চর্চার এক বিশাল ভাণ্ডার ।
বাবা মানে—স্বপ্ন এবং স্বপ্নিল ফানুস বাবা মানে—আমি এবং আমার নিজ জগৎ বাবা মানে—সহযাত্রী, সহযোদ্ধা, আমার পুঞ্জিভূত বিশেষ শক্তি লাঠি, বৈঠা, হাতিয়ার আমার শেষ স্পর্ধা ।
বাবা মানে—এই বুঝি এলো বাবা ভয়, আতংকের যন্ত্র বাবা মানে—নিজের অপরাধী সত্তা দমন করার মন্ত্র । বাবা মানে—একটা গোটা দুনিয়া আমার সুখে তাঁর সুখ হয়ে ওঠার তন্ত্র ।
বাবা মানে—সুখ, শ্রান্তি, প্রতিশ্রুতি কথায় কথায় আমার’ সম্বোধনের প্রশান্তি । বাবা মানে—আমার সোনাপাখি, জাদুমণি বারংবার ছলাকলায় আব্বা’ বলার কথন আমার কলজের টুকরা, পিতলা ঘুঘু, টিয়া, ময়না-বাবুটার’ অনবরত আয়োজন ।
বাবা মানে স্বাদ-আহ্লাদ পূরণের মাতুব্বরি বাবা মানে পুরো পৃথিবীটাকে নিজের করে ভাবার দুঃসাহসিক তালুকদারি ।
বাবা মানে স্বাধীনতা, নিশ্চিত ক্ষমা, প্রহরী অতন্দ্র বাবা মানে দ্ব্যর্থহীন, স্বার্থহীন আশ্রয়কেন্দ্র ।
বাবা মানে সাহস’ শব্দটার সর্বান্তকরণ বহিঃপ্রকাশ বাবা মানে আমার আমি, আমিত্ব, অধিকার নিজ বোধের বহুমাত্রিক রূপকার ।
বাবা মানে ‘আল্লাহর নেয়ামত’ আবদার পূরণের ভাণ্ডার কথা কবে রক্ত, ভাবনা কী আর ?
এই চিঠি পাওয়ার পর তুমি একটি বিয়ে করে নিও। আমি অনুমতি দিলাম। আমার মৃত্যুর বাকী আর ৭০ মিনিট ১৫ সেকেন্ড। আমি ভালো আছি। আমার কোনও দুঃখ নেই। তবে আমাকে ফাঁসি দেওয়ার কারণটা যদি জানতে পারতাম, সেটি আরও ভালো হতো। আমাকে কেন রাজাকার বানিয়ে দেওয়া হলো—প্রাপ্তবয়স্ক এই প্রশ্নের সদুত্তর জানার বড় ইচ্ছে ছিলো। তাই বাধ্যতামূলক আফসোস নিয়েই চলে যেতে হচ্ছে ।
আমি মসজিদে ইমামতি করতাম। যুদ্ধে গেলে মুসল্লিদের কে নামাজ পড়াবে এই ভেবে ভেবে, আমার আর যুদ্ধে যাওয়া হলো না। কিন্তু বিশ্বাস করো—গিয়াস, তপন, করিম মোল্ল্যা, সাত্তারসহ অনেক সশস্ত্র যোদ্ধাই আমার বাড়িতেই রাত্রি যাপন করত। প্রতিদিন রাত্রে ওদের সকলের খাওয়ার ব্যবস্থা আমিই করতাম। তপন ও গিয়াসের বাড়িতে পাকবাহিনী দুই দুইবার হামলা করেছে, দুইবারই আমি তপন ও গিয়াসের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছি। উর্দুতে কথা বলে আমি নিজেকে উজাড় করে দিয়ে তপন ও গিয়াসের পুরো পরিবারকে রক্ষা করেছি। আমার বাড়িতে গোপনে মুক্তিসেনাদের থাকা-খাওয়ার বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিবার লক্ষ্যে–আমাকে বেধে, পুরুষাঙ্গে বাটখারা ঝুলিয়ে, চান্দু খুনকার পাক আর্মিদের সাথে নিয়ে আমার ছোট বোনকে তুলে নিয়ে যায়। পরের দিন বস্তাবন্দী ফাতেমার বিবস্ত্র ও বিক্ষিপ্ত লাশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সেই চান্দু খুনকার এখন মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় । আশ্চর্য বিষয় হলো, চান্দু খুনকারই আমাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং অতি অলৌকিক ঘটনা হলো—যার পুরো পরিবারকে আমি রক্ষা করেছিলাম সেই গিয়াস আমার বিরুদ্ধে খুন ও ধর্ষণের অভিযোগের সাক্ষী দিয়েছে । জজ সাহেব আমাকে জিগ্যেস করেছে আপনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য কী না—আমি চান্দু খুনকার আর গিয়াসের চোখের দিকে তাক করে বলেছি, সব সত্য । পৃথিবীতে যত খুন ও ধর্ষণ হয়েছে—সব আমি একাই করেছি ।
যদিও প্রচণ্ড ঘৃণা আর অভিমান থেকে আমি বলেছি ‘সত্য’ তবে অভিযোগ অস্বীকার করলেও রায়ের কোনও পরিবর্তন হতো না। রায়, জজ সাহেব আগে থেকেই লিখে নিয়ে আসছে। পাক আর্মিদের নারী সাপ্লাই দেওয়া চান্দু খুনকার যদি আমাকে রাজাকারের খেতাব দেয়, সেখানে আমার সত্য-মিথ্যা দিয়ে আর কীই-বা হবে বলো ?
বাস্তবতা আমি মেনে নিয়েছি। আমার হাতে বেশি সময় নেই। তোমাকে অভাব, অনটন আর অভিযোগ ছাড়া আমি কিছু দিতে পারি নি। আমাকে ক্ষমা ভিক্ষা দিও। মার কথা একটু বেশি মনে পড়ছে। তার ছেলের ফাঁসি ! মা এটা কীভাবে মেনে নিবে ? এসব ভেবে আমার মাথা ক্রমশ নত হয়ে আসছে । তুমি বিয়ে করার পর আমার মাকে তোমার সাথে রেখো। এটা আমার আদেশ ।
আমার একটা মাত্র মেয়ের জন্যও কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। ব্যাপারটা দুঃখজনক। আমার টাকাপয়সা নেই। আমার মূলধন ছিল সততা। সেটিও বিক্রি হয়ে গেলো। সবাইকে তুমি দায়িত্ব নিয়ে বলো—আমি মান্নান, যুদ্ধাপরাধী নই। আমার বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা অভিযোগকে সত্য বলা ছাড়া আমি জীবনে একটা মিথ্যা কথাও বলি নি। খুন তো দূরের কথা আমি জীবনে কাউকে একটা চড়-থাপ্পড়ও দেইনি। ধর্ষণের অপবাদটা আমাকে আলাদাভাবে ব্যথিত করে তুলছে। খাদিজা তুমি তো ভালো করেই জানো, মেয়ে মানুষ দেখলে আমি মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতাম। সেই আমাকেই।
১০ ফুট বাই ৬ ফুটের এই কনডেমড সেলে থাকতে থাকতে কেমন যেন আমি প্রতিবন্ধীর মতো হয়ে গেছি। ফাঁসিতে ঝুলে পড়াটাই এই মুহূর্তে আমার কাঙ্খিত জয়ের সমান। জীবন, বেঁচে থাকা, নির্মোহ মমতা—কোনও কিছুকেই আমার আর নিজের বলে মনে হচ্ছে না। কেবল আসন্ন মৃত্যুকেই মনে হচ্ছে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি ।
সদ্যই কেবল তাঁহার কথা মনে পড়ে কী দিবস, কী রজনী, কী পড়ন্ত বৈকাল সে যেন জড়ায়ে ধরিয়াছে মোর সকল খেয়াল ।
চেতনার সকল রন্ধ্রে কতবার তালা লাগাইলাম— প্রাপ্তি হিসাবে জুটিলো কেবল অসহায় কতক রাত আর ধূলিমাখা পিচ্ছিল আর্তনাদ।
বাঁচিয়া থাকার অমোঘ শখ তাঁহাকে প্রায়শই ভুলাইয়া দেয় কিন্তু তাঁর নিষ্পাপ মুখখানির নিকট বাঁচিয়া থাকার আকুতি যখন অতীব নগণ্য হইয়া দাঁড়ায় তখন আর কী’ই বা করার ?
এক কাকডাকা ভোরে তাঁহার একখানি কথা’ কলিজাটা উতলাইয়া দিয়াছিল— ‘বুঝবি আমি না থাকলে বুঝবি’ !
আমি ঢের বুঝিয়াছি, তোর প্রত্যাশার চাইতে অনেক অনেক বেশি ? তুই হয়তো জানিস না মানুষের স্বভাব কখনো বদলায় না ।
মানুষ নামটাই কেবল আমাদের মহান করেছে; ভেতরটা স্বার্থপরতা, প্রবৃত্তিগত দায়, ক্ষমতা, কাম আর নানান রকমের লোভের চাদরে মোড়ানো ।
তোর কত অশ্রু, আর্তনাদ, ছোট্ট একটি সংসারের স্বাভাবিক স্বপ্ন আমার কাছে অতীব যতনে জমা করা আছে যদি পারিস, স্বপ্নগুলো ফেরত নিস ।
কেমন আছ তুমি, রাজকন্যা ? হৃদয়পুরের বাদশাহ আমার’ যার রক্তের মধ্যে তোমার বাস যার সুখের মধ্যে তোমার চাষ তুমিই বলো হে লক্ষ্মী সে তোমার খবর না নিয়ে থাকতে পারে ? তোমার ভালো থাকাটা যে তার বেঁচে থাকার ইন্দ্রজাল ।
আমি জানি, তুমি কেমন আছ তা জানার যৎসামান্য অধিকার আমি এবং আমার সর্বান্তকরণ পরান গহীনের আমিরও নেই’ । কষ্ট নিও না, অভিমান আর অশ্রুকে গুলিয়ে ফেলো না । তাদেরকে তাদের কক্ষপথে স্ব-স্ব দাপটে ঘুরতে দাও ।
না কি আবার প্রহসনে মেতে আছ না কী ঐ দূর আকাশে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে অদৃশ্যের মাঝে দৃশ্যমান কিছু তালাশে ব্যতিব্যস্ত থাকো ।
কাম-বাসনায় হন্যে হয়ে ভিন্নতা খুঁজে বেড়াও না তো আবার ! মিছেমিছি স্বামীর সাথে করো কী খেলা দুর্দান্ত অভিনয়ে মাতো কী সারাবেলা বালিশ-চাদরে মুখচেপে খুঁজো কী সান্ত্বনা ? স্বামীর ফাঁদে’ আটকে পড়া মানুষটার জোরজুলুমের সোহাগকে ভাবো না তো যন্ত্রণা ?
মনে আছে, সে আমায় জান বলি ডাকিত’ কইলজের মধ্যে পুঁইতা রাইখ্যা আমায় সে মাথার তাজ করি রাখিত । যে আমার লাগি কাঁদিত ক্ষণে ক্ষণে দেবে কী সে আর বলো অন্য জনে ?
৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে যুদ্ধক্যাম্পে যোগ দেওয়া মায়ের কাছে লেখা আজাদের একখানা চিঠি ।
মা
আমার উপর রাগ করো না। এই প্রথম তোমার অবাধ্য হলাম। তোমাকে বললে আমাকে তুমি যুদ্ধক্যাম্পে আসতে দিতে না তাই তোমাকে বলার সাহস পাইনি। গতকাল আতিকের মাকে পাকিস্তানি হানাদাররা তাদের ক্যাম্পে তুলে নিয়ে গেছে। তুমিই বলো মা, এই খবর শোনার পর আমি কী ঘরে বসে থাকতে পারি ? আমার এই দেশটা কী আমার মা নয় ? হয়ত তাঁকে মা বলে ডাকার সৌভাগ্য আমার হয় না কিন্তু তাই বলে কী আমার অনুভূতিতে তাঁর মমত্ব প্রবাহিত হয় না ! তুমিই বলো মা, তোমার ওপর কেউ আঘাত হানলে আমি কী ঘরে বসে থাকতে পারি ?
আমি ০৭ নং সেক্টরের অধিনস্থ আছি। সারা দিন ঘুরে ঘুরে আমি হানাদারদের অবস্থান নিশ্চিত করি এবং সেই খবর আমাদের ক্যাম্পে পৌঁছে দেই’ অতঃপর আক্রমণ। আমার মনটা একটু খারাপ। গতকাল আমার সহযোদ্ধা আরিফকে পাকিস্তানি হানাদারা মেরে ফেলেছে। মা, রাইফেল যে এত ওজন, আমি জানতাম না। রাইফেল বইতে বইতে আমার কাঁধে ঘা হয়ে গেছে; না মা’ আমার ঘায়ে যদি পোকাও পড়ে তারপরও আমার মাকে উদ্ধার না করে আমি তোমার কাছে ফিরব না ।
বাবার জন্য অনেক খারাপ লাগছে। প্রতিদিন ঘুমাবার আগে বাবা আমার দুই গালে চুমু দিয়ে যেত। এখন বাবা কী করে আমি জানি না। আমাকে ডাক্তার বানানোর জন্য বাবার অবিরাম প্রচেষ্টার কী হবে তাও বোধ করি আমি জানি না। আমি জানি মা, তোমরা কিছুতেই আমার বিষয়টা মেনে নিতে পারছ না। আমি জানি, এখানে আমার বেঁচে থাকার চাইতে মরে যাওয়ার সম্ভাবনা ঢের কিন্তু বিশ্বাস করো মা, আমি ভালো আছি। দেশ নামক মা’টার জন্য কিছু করতে পারছি, কী এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে বিহবল হয়ে আছি তা তোমাকে এই ছোট পরিসরে বোঝাতে পারব না। হানাদারদের মোকাবেলা যখন করি তখন শুধু একটা কথাই ভাবি—ওপরে আমার জন্য জান্নাত আর নিচে আমার মা। এই বোধের বাইরে অন্য কোনো বোধ এখনও আমার হৃদয় গহীনে বাসা বাঁধতে পারেনি ।
শিউলির খবর কী, মা ? আমার ইচ্ছা ছিল, একটা ভালো ছেলের সাথে শিউলির বিয়ে দেওয়ার। একটা ভালো ছেলে আমার পছন্দেরও আছে। না থাক, এখন বলব না। আল্লাহ্ যদি বাঁচিয়ে রাখে তবে তারপর। আমি যখন দরজার কপাট খুলে বের হই তখন আনুমানিক রাত ০৩ টা বাজে। লুনা, আমার দুই সন্তান মিতু, নিতু কিছুই টের পাইনি। অনেকটা চোরের মতোই বের হয়েছিলাম। মিতু আগের রাতে খুব করে একটা জামা কিনে দেওয়ার বায়না ধরেছিল, পরের দিন কিনে দেওয়ার কথা বলে ওকে ঘুম পাড়িয়েছিলাম। পারলে তুমি আমার মেয়েটাকে একটা জামা কিনে দিও।
মা তোমাকে যে আমি এত ভালোবাসি তা আমি আগে টের পাইনি। ক্যাম্পে আসার সময় আমার কেবলই মনে হয়েছে, পেছন থেকে কে যেন আমাকে বাজান বাজান’ বলে চিৎকার করছে। না মা’ আমি একটি বারের জন্যও পেছনে তাকাইনি। মা তোমাকে বাস্তববাদী হতে হবে। আল্লাহ্প্রদত্ত নাড়ির টানকে কুরবান করতে হবে, আমাদের আর একটা অশরীরী মায়ের জন্য।
সত্যি কথা বলতে কী’ মা, আমার জীবিত ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। তারপরও আল্লাহ্ যদি আমাকে বাঁচিয়ে রাখে, দেখা হবে পাক-হায়েনামুক্ত খোলা আকাশের নিচে । স্বপ্নের স্বপ্নিল আরাধনায়। নতুন এক বেশে । স্বাধীন পতাকার নিচে আমরা সবাই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে ধরে থাকব ।
লুনাকে নিয়ে আমি তেমন কিছু বলব না । তুমি যদি পারো ওকে একটু বুঝিয়ে বলো। আমার সন্তান দুইটিকে তুমি দেখে রেখো। আবারও তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আল্লাহ্ যদি বাঁচিয়ে রাখে দেখা হবে বিজয়ে ।
তোমার বাজান
পুনশ্চঃ না। আজাদ আর কখনোই ফিরে আসেনি। হানাদারমুক্ত স্বাধীন বাংলা তাঁর আর দেখা হয়নি। খবরটা শোনার পর তাঁর মা ০৭ দিন বেঁচেছিল, অতঃপর। আজাদ শহীদ হওয়ার আগে একাই বেশ কিছু পাকিস্তানি হানাদার মেরে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। তারই পরিণামে আজাদের বাড়িতে হানাদাররা পৈশাচিক আক্রমণ চালায়। আজাদের বৃদ্ধ বাবাকে গাছের সাথে ঝুলিয়ে বিবস্ত্র করে ফাঁসি দিয়ে মেরে ফেলা হয়। আজাদের দুই সন্তানকে বুটের নিচে পিষ্ট করে হত্যা করা হয় এবং আজাদের বোন শিউলি ও স্ত্রী লুনাকে হানাদাররা তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পরের দিন তাদের নিতম্বের মধ্য দিয়ে বাঁশ ঢুকিয়ে গাল দিয়ে বের করা ক্ষত-বিক্ষত লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায় নদীর ধারে ।
ওপরের সব চরিত্রই প্রতীকী হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে কিন্তু স্বাধীন বাংলার পেছনের ইতিহাস এর চাইতেও ঢের করুণ । হাজারো আজাদ, হাজারো বাবা-মার চোখের জলের বিদীর্ণ পথ পেরিয়ে, লক্ষ শিউলি আর লুনার সম্ভ্রমের দামে কেনা আমার এই স্বাধীন বাংলা। এত মহানুভবতা, এত আবেগের জলাঞ্জলি, এত রক্তের দামে কেনা এই স্বাধীন বাংলাদেশ, আমরা যারা এখনও পরাধীন করে রেখেছি কব্জির জোরে অথবা নিজের স্বার্থের তিয়াসা মেটানোর জন্য—আমরা মোটেও হানাদারদের চরিত্রের বাইরের কোনো চরিত্র আজ অবধি হতে পারিনি ।
আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝাতে হবে না তুমি আমার নও ! জানি, আমি জানি, তুমি আমার নও। আমি জানি, নিরুপমা এখন নিরুদ্দেশ।
তুমি এখন আষাঢ়ের ভুতুড়ে কোনো গল্প আমি জানি, তুমি এখন পরিত্যক্ত রায়-বাড়ির গুমোট, ধ্রুপদী আওয়াজের তোপধ্বনি মাত্র ।
আকাশে-বাতাসে এক শ হাত মাটির নিচে বাঁশের ঝাড়ে, ভুতুম প্যাঁচার অপ্রস্তুত ঘন ঘন ডাকে বুকের মাঝে ধপাৎ করে ওঠার সংকেতে রোদেলা দুপুরের বটের প্রশান্তিতে বাচ্চা ছেলেটার প্রথম মা বলে ওঠার আকুতিতে নিঃশ্বাসে, বিশ্বাসে কোথাও তোমার অস্তিত্বের গন্ধও নেই ।
এমনকি কল্পনাতেও তোমার ছবি অস্পষ্ট ঝাপসা একখানা অবয়ব অপলক দৃষ্টিতে মাঝে মাঝেই কী যেন একটা প্রশ্ন করে ? যদিও তাঁর প্রশ্নটা স্পষ্ট নয় তারপরও উত্তর দেওয়ার দুঃসাহস দেখানো হয়নি কখনো।
এইতো গত পরশু নীলাভ এক বিকেলকে সাহস করে ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেম— ওর কোনো খবর তোমার কাছে আছে, কেমন আছে ও ? জিজ্ঞেস করতেই বিকেলের আবহে মুখখানা ভারী করে সন্ধ্যা নেমে এলো বুঝলাম ও ভালো নেই ।
বড় সাধ ছিল তোমার স্পর্শে জীবনের মানে বোঝার; সাধ ছিল তোমার কবুল বলার ভঙ্গিটা দেখার ।
সাধ ছিল চাঁদকে সাথে নিয়ে সারারাত ডিঙ্গি নৌকায় ঘুরে ফেরার, জ্যোৎস্নার আলোকে জিম্মি করে মুদ্রাহীন ছন্দের তালে তালে ঢলাঢলি করার ।
সাধ ছিল পুরোদস্তুর স্বপ্নাতুর বনে যাবার অধরা স্বপ্নের খুব কাছাকাছি চলে যাবার । সাধ ছিল ভালোবাসাকে চেটেপুটে খাওয়ার, আকস্মিক চুম্বনে তোমার ঘর্মাক্ত লালা শুষে নেওয়ার ।
সাধ ছিল একটি সন্তান, কন্যা সন্তান; দেখতে তোমার মতো হবে, আমার অনুভূতির মাস্তান । সাধ ছিল তোমার মুখ থেকে ঘন ঘন ‘এই শুনছো’ শুনার।
উচ্চাভিলাষী বিরামহীন ঝগড়া শেষে দুজন দু’কাত হয়ে ঘুমের ভান করে সারানিশি চোখ বড় করে চেয়ে থাকার ।
একটি দোতলা বাড়ি, একটি ছোট সংসার দুজন মিলে একটি জীবন, আবহ চমৎকার । বড় সাধ ছিল শিশুতোষ ভালোবাসায় তোমাকে আগলে রাখার, নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়ে তোমাকে নির্মাণ করার।
সর্বান্তকরণ আবেগের মাঝেই অবুঝ প্রেমের বসবাস। আবেগকে প্রশমিত করে ভালোবাসার ঝাণ্ডা তুলে ধরা মোটেও সহজসাধ্য নয়। ভালোবাসার অনন্যসাধারণ বোধসমূহের যথার্থ মূল্যায়ন করেই যে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ানো যায়, তারই যথার্থতার প্রকাশ—জেলখানার কয়েদি মেহেদী হাসান নীলের কাছে লিখা ইসরাত জাহান আশার একখানা জীবনবাদী পত্র ।
নীল
দুর্নিবার কোনও আকর্ষণ আমার স্বাভাবিকতায় অথবা স্বপ্নিল আরাধনায় হানা দিতে পেরেছে কি না মনে পড়ে না । অঝরে কারও জন্য একাকী কেঁদেছি নাকি তাও বলা মুশকিল । কারও প্রতি অতিশয় আসক্তির চেতনা আমাকে কখনো শাসন করতে পেরেছে কি না তাও বোধ করি আমিই জানি না । সোজা কোথায় তোমার প্রতি সামান্যতম আনুগত্য কোনও কালেই আমার ছিল না তবে আমাকে পাওয়ার জন্য তোমার অমানুষিক পরিশ্রম’ আমার হৃদয় গহীনে যে একেবারে দাগ কাটেনি তাও বলা যাবে না । কিন্তু সেই হাড়ভাঙ্গা শ্রমের বিনিময়ে তুমি আমার কাছ থেকে যা নিয়েছ তাকে আর যাই হোক ভালোবাসা বলা যাবে না । একজন নাছোড়বান্দা ভিখারিকে ভিক্ষা দেওয়া অথবা শ্রমের বিপরীতে পারিশ্রমিকের নামে করুণা দেওয়া বলাই ঢের শ্রেয়।
খুব ছোটবেলা থেকেই আমি নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করি। নিয়মের দেওয়ালগুলো কখনোই আমার কাছে অনিয়ম হতে পারেনি। আমি যখন মায়ের সাথে শিল্পকলায় গান শিখতে যেতাম, তুমি বিনা কারণেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাকে এক নজর দেখার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে, বিশ্বাস করো একটি দিনও আমি ভাবিনি ওই মানুষটা কেন আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে ?
আমাদের বাড়ির সামনের আম গাছটায় তাবিজ ঝুলানো দেখতাম; ওই দেখা পর্যন্তই । আমি বুঝতাম কিন্তু তাবিজ কে রেখেছে তা নিয়ে কোনো বিশেষ ঝোঁক আমার হৃদয়ের চিলেকোঠায় পরিলক্ষিত হয়নি। নারকেল গাছ বেয়ে তুমি রাত-বিরাতে আমাদের চালের ওপর বসে থাকতে শুধু আমাকে এক নজর দেখার জন্য । চালের উপর ঘুমিয়ে থাকার জন্য একদিন আমাদের বাড়ির লোকজন তোমাকে অনেক মারধর করল। পরে জানা গেলো অনেকগুলো ঘুমের বড়ি খাওয়ার জন্য তুমি আনমনে চালের উপরই তন্দ্রার ঘোরে হারিয়ে গিয়েছিলে । বেধড়ক পেটানোর জন্য তোমার বাম হাতটা ভেঙ্গে গিয়েছিল এবং তুমি সেই ভাঙ্গা হাতের ব্যান্ডেজ পরিহিত অবস্থায় আমার সামনে দিয়ে ঘুরঘুর করতে । উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার কিন্তু আমি আরও বিরক্ত । ওই মুহূর্তে করুণা তো দূরের কাব্য, এক ফালি ঘৃণিত বোধের সঞ্চারণও তুমি করতে পারোনি ।
আমার সুশৃঙ্খল জীবনটা অতিষ্ঠ করে দিয়েছিলে তুমি। কলেজের সামনে একদিন আমাকে তুমি কি যেন কী বলতে চাইলে; আমি দৌড়ের মতো করে হাঁটতে শুরু করলাম । আমার মা অনেক বন্ধুদের সামনে তোমার গালে কসে থাপ্পড় মারল । তোমার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল, তুমি কোনো কথা বলোনি তবে তোমার অশ্রুর অন্তর্যামী ভাষা বুঝে নিতে আমার দেরি হয় নি। এই প্রথম তোমার বিষয়টা আমাকে খানিকটা স্পর্শ করল। তোমার আবেগ, পুঞ্জিভূত কিছু অভিমান এবং অভিযোগের অশ্রু আমাকে বিচলিত করতে সক্ষম হলো। তবে তোমার সেই বাঁধভাঙা চোখের জল আমার করুণার দেওয়াল টপকাতে পারেনি ।
এভাবেই চলছিল আমাদের দিনকাল । ইতিমধ্যে তুমি বেশ কয়েকবার মেট্রিক পরীক্ষায় ফেল করলে আর আমি গোল্ডেন এ প্লাসসহ ইন্টারমিডিয়েট শেষ করলাম সুতরাং দিন কে দিন পরিস্থিতি তোমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে লাগল । কলেজে পড়া অবস্থায় মাসুদ রানা নামক একটা বাবুগোছের ছেলের সাথে আমার যৎসামান্য সম্পর্ক হয়েছিল । সত্যি কথা বলতে কী এই সম্পর্কের ব্যাপারটায় মাসুদের তেমন কোন ভূমিকা ছিল না উপরন্তু আমিই তাকে অনেকটা জোরপূর্বক রাজি করিয়েছি । আমি জানি তুমি কষ্ট পাচ্ছ । না নীল, কষ্ট পাওয়ার তেমন কিছু নেই । এটাই ঢের বাস্তবতা এবং ধ্রুব সত্য ।
মানুষ তার নিজের ইচ্ছাতে প্রেমে পড়তে পারে না । এটা আনমনে, বেখেয়ালে অথবা হেয়ালির ছলে একাকী হয়ে যায় । সমস্ত নিয়মের বলয় ভেঙ্গে অপরিপক্ক বোধসমূহের ছোট ছোট কিছু ভুলের মাঝেই এই প্রেমের বসবাস। এটি হতে পারে একটা মানুষের সর্বোত্তম আবেগের এবং সর্বান্তকরণ ক্ষমার অদ্ভুত এক বহিঃপ্রকাশ । প্রেম কেমনে হয়, কে করায়, কে মধ্যস্থতা করে, কে এর লাটাই ঘুরায় তা জানার সময় কই বরং তাঁর মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকার প্রশান্তি নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকতে পারে অনাদিকাল অথবা মরে যেতেও যেন তাঁর কোনো বাধা নেই ।
খুব সহজ করে বলতে গেলে, আমাকে তোমার কেন ভালো লেগেছে তা যেমন তুমি জানো না; ঠিক মাসুদ রানাকে ভালো লাগার কোনও যৌক্তিক কারণ আমার কাছে আপাতত নেই । তবে মাসুদের প্রতি আমার দুর্বলতার প্রকাশ একেবারেই সামান্য । সে মোটেও আমার চিন্তার ধারাপাতে কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি । তাকে আমার ভালো লাগত কেবল এতটুকুই । যখন শুনলাম মাসুদ বিবাহিত, আমার মনটা একটু খারাপ হলো কিন্তু আমি তাকে প্রতারক ভাবিনি কারণ দোষটা আমারই ।
আমার সাথে স্পষ্ট করে তুমি কথা বলতে পারতে না । তোতলাতে আর যা বলতে তা কি ফ্রেঞ্চ নাকি হিব্রু তা নিয়ে আমি সন্দিহান থাকতাম অথচ আমি শুনেছি তুমি নাকি চমৎকার গান করো এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নান্দনিক উপস্থাপনা করো।
সেই তুমি বেশ সাবলীলভাবে একদিন আমাকে ফোন করে জানিয়ে দিলে তুমি আমাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে চাও । আমি তোমাকে মোটেও ভালোবাসতাম না এটা সত্য কিন্তু বিশ্বাস করো আমি বোধ হয় তোমার ওই প্রস্তাবটার জন্যই বসে ছিলাম কারণ আমি এটা বুঝতাম, আমার তাকেই বিয়ে করা উচিত যে আমাকে ভালোবাসে । যাই হোক, আমি বীরাঙ্গনা বেশে তোমার হাত ধরে পালিয়ে গেলাম ।
আমরা বোধ হয় এক মাস একসাথে ছিলাম । তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসো, সন্দেহাতীতভাবে তা প্রমাণিত। কিন্তু ভালোবাসাই যে সর্বশেষ কথা নয় এবং এটি আবেগের চাদরে মোড়ানো কয়েকটি বর্ণ মাত্র, এই প্রথম শরীর এবং হৃদয়ের দামে আমি তা বুঝে নিলাম । একটি টাকাও তোমার কাছে নেই, ভরসা কেবল চুরি করে আনা আমার মায়ের গহনা সকল । তোমার সাথে আমার কিছুই মিলছে না। আমি পরিপাটি, মার্জিত বোধের দাস আর তুমি অগোছালো, নোংরা, মাদকাসক্ত, গালি ছাড়া কথা বলতে পারো না কেমন যেন বস্তির উদ্বাস্তু জীবনের চিত্র তোমার মধ্যে বহমান । আমি বড় বিপদে পড়ে গেলাম ।
ইতিমধ্যে আমার বাবা-মা পাগলের মতো আমাকে খুঁজে-ফিরছে । তোমার নামে গোটা দশেক মামলা রুজু করা হলো । আমার বাবা অনেক প্রভাবশালী এবং শিল্পপতি হওয়ায় তুমি খুব ভয় পেতে । পুলিশ তোমাকে ধরে নিয়ে গেলো এবং তারপর থেকে তুমি এখন অবধি জেলেই আছ । তোমার হতদরিদ্র বাবা-মার সাথে আমার কথা হয় । তারা তোমার জামিন করানোর জন্য আমার কাছে অনেকবার এসেছে। আমিও বিরামহীন চেষ্টা করে যাচ্ছি কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। আমার বাবা-মার সাথে এখন আমার কোনও সম্পর্ক নেই । প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করছি । ওপরের ঠিকানায় আছি ।
না। আমি তোমার কাছে আর ফিরে যাব না এবং আমি তোমাকে একতরফাও দিয়ে দিয়েছি। নীল, শুধু ভালোবাসা আর আবেগের মূর্ছনা দিয়ে সংসারের বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়াটা কঠিন । তবে তুমি আমার জন্য সারাজীবন যে অমানুষিক নির্যাতনের স্বীকার হয়েছ তা ভেবে আমি কষ্ট পাই ।
কি না করেছ তুমি আমার জন্য ! আমি তোমাকে ভালোবাসতে পারিনি সত্য কিন্তু তারপরও তোমাকে আমার লক্ষ্মী, সোনা, মানিক বলতে ইচ্ছা করছে। তোমার এতিম, অবুঝ ভালোবাসাকে প্রণাম না জানালে যে ভালোবাসাকেই অপমান করা হবে। আমি বাস্তববাদী তবে ভুলের ঊর্ধ্বের কেউ নয়। আশা করি আমাকে ক্ষমা করবে। নিঃশর্ত ক্ষমা !
সুরাইয়া জাহান শারমিনের আত্মহননের মধ্য দিয়ে জয় হয়েছিল ভালোবাসার, হার মেনেছিল সমস্ত জাতের’ অনতিক্রম্য বিভেদ সকল। জীবনের অসহায় বাস্তবতার কাছে প্রিয়তার পরাজয়, জীবনের পরাজয়, তাঁরই নীলাভ রক্তিম বহিঃপ্রকাশ–অখিল চন্দ্র দাসের কাছে লিখা, শ্রীকান্ত বাবুর একখানা পত্র ।
প্রিয় অখিল
আমার আশীর্বাদ নিও । দীর্ঘদিন তোমার সমাচার নেওয়া হয় না বলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি । আমার উপর আত্মিক অভিমান পুষে রেখো না । তুমি শুধু আমার বাল্যবন্ধুই না, তুমি আমার চোখের নোনা জলের অশরীরী আবেগ প্রকাশ করার একমাত্র মাধ্যম, তুমি আমার অপরিপক্ক অনুভূতির অলিখিত আশ্রয় কেন্দ্র । লিখিত বলতে পারলাম না কেবল শারমিনের জন্য। শারমিনের প্রিয়তার কতটা দাস আমি তা কেবল তুমিই জানো, সেইজন্য শারমিনের মতোই আমি তোমাকে নিজের মনে করি ।
আমি ক্যালিফোর্নিয়াতে আছি প্রায় ১২ বছর অথচ একটি দিনও মনে হয়নি, আমি আমার আমিত্ববোধ থেকে দূরে আছি, আমিত্ববোধ বলতে আমি কাকে ইঙ্গিত করেছি তা তুমি ভালো করেই জানো যদিও সেই বোধের যৎসামান্য একটা অংশ তুমিও বৈকি । আচ্ছা অখিল, জাত’ শব্দটার মানেটা আসলে কী ? জাতিগত বিভেদ, সাম্প্রদায়িক বৈষম্য অথবা বিভিন্ন জাতের বিভেদ, বৈষম্য দ্বারা লালিত হয়ে বেঁচে থাকার বস্তুনিষ্ঠ সংজ্ঞা আসলে কী, আমাকে তুমি একটু বুঝিয়ে বলতে পারো ?
বন্ধু তুমিই বলো, জাতই’ যদি সবকিছুর নির্ণায়ক হয়ে থাকে তবে মানুষ’ শব্দটার কী প্রয়োজন ছিল ? আমি হিন্দুর ছেলে হওয়ার কারণে শারমিনের বাবা আমাদের বিয়েতে রাজি হল না আর শারমিনের বাবারই বা কিসের দোষ ? আমার বাবা অমিত গঙ্গোপাধ্যায়, আমাকে বলে দিলো, আমরা ব্রাহ্মণ-সুতারং আমাদের যা তা করলে চলবে না, আমরা নাকি সকল দেবতার দ্বারা অভিশপ্ত হব এবং এও বলল মুসলমানের মেয়েকে যদি তুমি বিয়ে করো তাহলে সেই বিয়ের দিনই তুমি আমার মুখে আগুন দিও । আর আমার মা’ তো পারলে প্রতিদিনই শীতলক্ষ্যায় ডুবে মরে ।
মাঝে মাঝে চোখের জলকে’ প্রশ্ন করতাম, এই নিষ্ঠুর বোধের জগতে এত মানবী থাকতে শারমিনের দাস কেন হলাম ? চোখের ভারী নোনা জল আমাকে জানিয়ে দিত–প্রেমের অদৃশ্য বোধকে আমি যদি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম তাহলে কখনোই আমি তোমায় শারমিনকে দেখাতাম না । বন্ধু আমার, তুমি জানো কীনা জানি না, আমি গোপনে মুসলমান হতে চেয়েছিলাম কিন্তু কিভাবে যেন বাবা টের পেয়ে গেলেন এবং সত্যি সত্যি তিনি ইঁদুর মারার বিষ খেলেন কিন্তু না, আমার পিতা অমিত গঙ্গোপাধ্যায় মরেননি, তিনি তাঁর ঈশ্বরপ্রদত্ত পাওয়া জাত’ এবং জাতের গরিমা নিয়ে এখনো দিব্যি বেঁচে আছেন ।
জাত জাত’ করে যাদের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল, তারা সবাই বেঁচে আছে শুধু আমার শারমিন ! বন্ধু, আমার কলম আর চলছে না, কালির বদলে চোখের জল দিয়ে যদি চিঠি লেখা যেত, বোধ করি তা করতে আমার তেমন কোন অসুবিধা হত না । আমার শারমিন, আমার জন্য বিষ খেয়ে মরে গেলো অথচ আমি কত সুন্দর বেঁচে আছি ! আবার মাঝে মাঝে আমি স্বপ্নও দেখি, কী ভয়ংকর দানব আমি, কতটা অমানুষ হলে এমনটা করা যায়, একবারো কী ভেবে দেখেছ ?
অখিল তোমার খবর কী ? বৌদি, তোমার সন্তানেরা কেমন আছে, প্রকাশ আর নিখিলের কী অবস্থা, তোমরা কী তিন ভাই একসাথেই আছ নাকি পশ্চিমাদের মতো স্বতন্ত্র বোধ’ তোমাদের পেয়ে বসেছে ?
বন্ধু, বন্ধু আমার, জগতে যত মানুষ দেখো–তাদের প্রত্যেকেরই স্বীয় একটা ভুবন আছে, আলাদা একটা চেতনার জটলা আছে, নিজস্ব একটা খোলা আদালত আছে এবং সেই আদালতের বিচারক সে নিজেই । আশ্চর্যজনক বিষয়টা হলো, সেই আদালতের সব রায় তাঁর পক্ষেই যায়, ভাবখানা এমন, সে যেন ফেরেশতা সমতুল্য অথবা ভুলের ঊর্ধ্বের একজন । ডাকাত যখন ডাকাতি করে তার সত্তায় একটিবারের জন্যও অপরাধের বোধ বাসা বাধে না, অপরাধকে অপরাধ মনে করে সম্পাদন করা মোটেও কোনো সহজ কাজ নয়, অখিল ।
কারো প্রতি আমার কোন অভিযোগ বা অনুযোগ নেই । আমার বাবা-মা হয়ত এখনো জানে, তারা ঠিক কাজটিই করেছে আবার আমার বোধই যে সঠিক তাও বলা যাবে না । হয়ত বিধাতা আমাদের অন্তর্যামী কল্যাণের কথা ভেবেই এমন জটিল সমীকরণগুলো তাঁর স্বীয় নিয়ন্ত্রণে রেখে দিয়েছেন ।
অখিল, মা’ নামক আমার দেশটার খবর কী ? সেই ৭১ এর দিনগুলো কী আজো তোমাকে অবিরাম তাড়িয়ে বেড়ায় ? যুদ্ধকালীন ০৯ মাস আমরা এক বিছানায় ঘুমিয়েছিলাম, পাকিস্তানি দানবদের কী ভয়ঙ্কর অত্যাচার, কে কোন জাতের’ তা তারা বিচার করত লুঙ্গি-পায়জামা খোলার ধৃষ্টতা দেখিয়ে এবং সেই অনুসারে শাস্তি নির্ধারণ করত, কতটা পাষণ্ড হলে এমনটা করা যায় !!
যুদ্ধরত অবস্থায় রাজাকার বাহিনী আমার বড় দিদিকে আমাদের বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্পে তুলে দিলো । আমার সেই দিদিটা বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে তা আমি আজও জানি না । যে রাজাকারের বাহিনী আমার দিদিকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল– বেশ কয়েক বছর পূর্বে তাকে ক্যালিফোর্নিয়াতে একটা অনুষ্ঠানে দেখেছিলাম, আমদের দেশের দামাল ছেলেরা, যাদের জন্ম মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে, দেখলাম সেই রাজাকারকে তারা পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে বীর মুক্তিযোদ্ধা বলে । ওইখানে অনেক পুলিশ থাকায় আমার করার তেমন কিছুই ছিল না; বিড়বিড় করে হয়ত কারো কাছে আমি অভিশাপ দিয়েছি মাত্র।
বন্ধু , যতটুকু পারো মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকারের বোধ ও ইতিহাস কিছু উঠন্ত দামালের সঙ্গে ভাগাভাগি করে যেও । যে বোধের দায়বদ্ধতায় আমরা যুদ্ধ করেছি, সেই বোধসমূহ কে কাঁচা-নবীনের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া যে আমাদের আর একটা যুদ্ধ, আর একটা পবিত্র দায়িত্ব ।
অখিল, তুমি তো জানো, শারমিনের সাথে আমার তুঁই-তুঁই সম্পর্ক ছিল । ও সারাদিন আমাকে নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থাকত । আমার সব, আমার সব কিছু ও’ নিয়ন্ত্রণ করত। আমার নাওয়া- খাওয়া, ঘুম, কোন জামার সাথে কোন প্যান্ট, কোন স্যান্ডেল, কোন জুতো–সব ও দেখভাল করত। ও যদি পারত–ওর কবরের মাঝখানে আমাকেও রেখে দিত কিন্তু আমার মতো হায়না দিয়ে কী আর সেই কাজ করানো সম্ভব?
মাঝে মাঝেই, ও আমাকে বলত, আমি না থাকলে তুঁই বুঝবি ! শারমিন, আমার শারমিন, তুঁই তোঁর জীবন দিয়ে তোঁর না থাকার মানেটা আমাকে বুঝিয়ে গেলি । লিখতে পারলে আরো দুচারটা লাইন আমি লিখতাম, বন্ধু কিন্তু চোখের জল শুকিয়ে যাওয়ার কারণে আর আমি পারছি না ভাই , নশ্বর এই রঙ্গমঞ্চে যতটা ভালো থাকা যায় তুমি ততটাই ভালো থেকো ।