ফাঁসির মঞ্চ থেকে ইমাম সাহেব বলছি । মুহাম্মাদ ইমরান । Fasir Monch Theke Imam Saheb Bolci . Kobi Imran .

ফাঁসির আগে আব্দুল মান্নানের লেখা শেষ চিঠি

প্রিয়তমা খাদিজা

এই চিঠি পাওয়ার পর তুমি একটি বিয়ে করে নিও। আমি অনুমতি দিলাম। আমার মৃত্যুর বাকী আর ৭০ মিনিট  ১৫ সেকেন্ড। আমি ভালো আছি। আমার কোনও দুঃখ নেই। তবে আমাকে ফাঁসি দেওয়ার কারণটা যদি জানতে পারতাম, সেটি আরও ভালো হতো। আমাকে কেন রাজাকার বানিয়ে দেওয়া হলো—প্রাপ্তবয়স্ক এই প্রশ্নের সদুত্তর জানার বড় ইচ্ছে ছিলো। তাই বাধ্যতামূলক আফসোস নিয়েই চলে যেতে হচ্ছে ।

আমি মসজিদে ইমামতি করতাম। যুদ্ধে গেলে মুসল্লিদের কে নামাজ পড়াবে এই ভেবে ভেবে, আমার আর যুদ্ধে যাওয়া হলো না। কিন্তু বিশ্বাস করো—গিয়াস, তপন, করিম মোল্ল্যা, সাত্তারসহ অনেক সশস্ত্র যোদ্ধাই আমার বাড়িতেই রাত্রি যাপন করত। প্রতিদিন রাত্রে ওদের সকলের খাওয়ার ব্যবস্থা আমিই করতাম। তপন ও গিয়াসের বাড়িতে পাকবাহিনী দুই দুইবার হামলা করেছে, দুইবারই আমি তপন ও গিয়াসের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছি। উর্দুতে কথা বলে আমি নিজেকে উজাড় করে দিয়ে তপন ও গিয়াসের পুরো পরিবারকে রক্ষা করেছি। আমার বাড়িতে গোপনে মুক্তিসেনাদের থাকা-খাওয়ার বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিবার লক্ষ্যে–আমাকে বেধে, পুরুষাঙ্গে বাটখারা ঝুলিয়ে, চান্দু খুনকার পাক আর্মিদের সাথে নিয়ে আমার ছোট বোনকে তুলে নিয়ে যায়। পরের দিন বস্তাবন্দী ফাতেমার বিবস্ত্র ও বিক্ষিপ্ত লাশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সেই চান্দু খুনকার এখন মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় । আশ্চর্য বিষয় হলো, চান্দু খুনকারই আমাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং অতি অলৌকিক ঘটনা হলো—যার পুরো পরিবারকে আমি রক্ষা করেছিলাম সেই গিয়াস আমার বিরুদ্ধে খুন ও ধর্ষণের অভিযোগের সাক্ষী দিয়েছে । জজ সাহেব আমাকে জিগ্যেস করেছে আপনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য কী না—আমি চান্দু খুনকার আর গিয়াসের চোখের দিকে তাক করে বলেছি, সব সত্য । পৃথিবীতে যত খুন ও ধর্ষণ হয়েছে—সব আমি একাই করেছি ।

যদিও প্রচণ্ড ঘৃণা আর অভিমান থেকে আমি বলেছি ‘সত্য’ তবে অভিযোগ অস্বীকার করলেও রায়ের কোনও পরিবর্তন হতো না। রায়, জজ সাহেব আগে থেকেই লিখে নিয়ে আসছে। পাক আর্মিদের নারী সাপ্লাই দেওয়া চান্দু খুনকার যদি আমাকে রাজাকারের খেতাব দেয়, সেখানে আমার সত্য-মিথ্যা দিয়ে আর কীই-বা হবে বলো ?    

বাস্তবতা আমি মেনে নিয়েছি। আমার হাতে বেশি সময় নেই। তোমাকে অভাব, অনটন আর অভিযোগ ছাড়া আমি কিছু দিতে পারি নি। আমাকে ক্ষমা ভিক্ষা দিও। মার কথা একটু বেশি মনে পড়ছে। তার ছেলের ফাঁসি ! মা এটা কীভাবে মেনে নিবে ? এসব ভেবে আমার মাথা ক্রমশ নত হয়ে আসছে । তুমি বিয়ে করার পর আমার মাকে তোমার সাথে রেখো। এটা আমার আদেশ ।

আমার একটা মাত্র মেয়ের জন্যও কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। ব্যাপারটা দুঃখজনক। আমার টাকাপয়সা নেই। আমার মূলধন ছিল সততা। সেটিও বিক্রি হয়ে গেলো। সবাইকে তুমি দায়িত্ব নিয়ে বলো—আমি মান্নান, যুদ্ধাপরাধী নই। আমার বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা অভিযোগকে সত্য বলা ছাড়া আমি জীবনে একটা মিথ্যা কথাও বলি নি। খুন তো দূরের কথা আমি জীবনে কাউকে একটা চড়-থাপ্পড়ও দেইনি। ধর্ষণের অপবাদটা আমাকে আলাদাভাবে ব্যথিত করে তুলছে। খাদিজা তুমি তো ভালো করেই জানো, মেয়ে মানুষ দেখলে আমি মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতাম। সেই আমাকেই।

১০ ফুট বাই ৬ ফুটের এই কনডেমড সেলে থাকতে থাকতে কেমন যেন আমি প্রতিবন্ধীর মতো হয়ে গেছি। ফাঁসিতে ঝুলে পড়াটাই এই মুহূর্তে আমার কাঙ্খিত জয়ের সমান। জীবন, বেঁচে থাকা, নির্মোহ মমতা—কোনও কিছুকেই আমার আর নিজের বলে মনে হচ্ছে না। কেবল আসন্ন মৃত্যুকেই মনে হচ্ছে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি ।

তোমার মান্নান  

মুহাম্মাদ ইমরান

৮ ৯ ২৬

৭ নং সেক্টর থেকে আজাদ | মুহাম্মাদ ইমরান | জগৎশ্রেষ্ঠ এক পত্র | 7 No. Sector Theke Azad | Kobi Muhammad Imran |

kobi imran.muhammad imran,

৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে যুদ্ধক্যাম্পে যোগ দেওয়া মায়ের কাছে লেখা আজাদের একখানা চিঠি ।

মা

আমার উপর রাগ করো না। এই প্রথম তোমার অবাধ্য হলাম। তোমাকে বললে আমাকে তুমি যুদ্ধক্যাম্পে আসতে দিতে না তাই তোমাকে বলার সাহস পাইনি। গতকাল আতিকের মাকে পাকিস্তানি হানাদাররা তাদের ক্যাম্পে তুলে নিয়ে গেছে। তুমিই বলো মা, এই খবর শোনার পর আমি কী ঘরে বসে থাকতে পারি ? আমার এই দেশটা কী আমার মা নয় ? হয়ত তাঁকে মা বলে ডাকার সৌভাগ্য আমার হয় না কিন্তু তাই বলে কী আমার অনুভূতিতে তাঁর মমত্ব প্রবাহিত হয় না ! তুমিই বলো মা, তোমার ওপর কেউ আঘাত হানলে আমি কী ঘরে বসে থাকতে পারি ?


আমি ০৭ নং সেক্টরের অধিনস্থ আছি। সারা দিন ঘুরে ঘুরে আমি হানাদারদের অবস্থান নিশ্চিত করি এবং সেই খবর আমাদের ক্যাম্পে পৌঁছে দেই’ অতঃপর আক্রমণ। আমার মনটা একটু খারাপ। গতকাল আমার সহযোদ্ধা আরিফকে পাকিস্তানি হানাদারা মেরে ফেলেছে। মা, রাইফেল যে এত ওজন, আমি জানতাম না। রাইফেল বইতে বইতে আমার কাঁধে ঘা হয়ে গেছে; না মা’  আমার ঘায়ে যদি পোকাও পড়ে তারপরও আমার মাকে উদ্ধার না করে আমি তোমার কাছে ফিরব না ।

বাবার জন্য অনেক খারাপ লাগছে। প্রতিদিন ঘুমাবার আগে বাবা আমার দুই গালে চুমু দিয়ে যেত। এখন বাবা কী করে আমি জানি না। আমাকে ডাক্তার বানানোর জন্য বাবার অবিরাম প্রচেষ্টার কী হবে তাও বোধ করি আমি জানি না। আমি জানি মা, তোমরা কিছুতেই আমার বিষয়টা মেনে নিতে পারছ না। আমি জানি, এখানে আমার বেঁচে থাকার চাইতে মরে যাওয়ার সম্ভাবনা ঢের কিন্তু বিশ্বাস করো মা, আমি ভালো আছি। দেশ নামক মা’টার জন্য কিছু করতে পারছি, কী এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে বিহবল হয়ে আছি তা তোমাকে এই ছোট পরিসরে বোঝাতে পারব না। হানাদারদের মোকাবেলা যখন করি তখন শুধু একটা কথাই ভাবি—ওপরে আমার জন্য জান্নাত আর নিচে আমার মা। এই বোধের বাইরে অন্য কোনো বোধ এখনও আমার হৃদয় গহীনে বাসা বাঁধতে পারেনি ।

শিউলির খবর কী, মা ? আমার ইচ্ছা ছিল, একটা ভালো ছেলের সাথে শিউলির বিয়ে দেওয়ার। একটা ভালো ছেলে আমার পছন্দেরও আছে। না থাক, এখন বলব না। আল্লাহ্ যদি বাঁচিয়ে রাখে তবে তারপর। আমি যখন দরজার কপাট খুলে বের হই তখন আনুমানিক রাত ০৩ টা বাজে। লুনা, আমার দুই সন্তান মিতু, নিতু কিছুই টের পাইনি। অনেকটা চোরের মতোই বের হয়েছিলাম। মিতু আগের রাতে খুব করে একটা জামা কিনে দেওয়ার বায়না ধরেছিল, পরের দিন কিনে দেওয়ার কথা বলে ওকে ঘুম পাড়িয়েছিলাম। পারলে তুমি আমার মেয়েটাকে একটা জামা কিনে দিও।

মা তোমাকে যে আমি এত ভালোবাসি তা আমি আগে টের পাইনি। ক্যাম্পে আসার সময় আমার কেবলই মনে হয়েছে, পেছন থেকে কে যেন আমাকে বাজান বাজান’ বলে চিৎকার করছে। না মা’ আমি একটি বারের জন্যও পেছনে তাকাইনি। মা তোমাকে বাস্তববাদী হতে হবে। আল্লাহ্‌প্রদত্ত নাড়ির টানকে কুরবান করতে হবে, আমাদের আর একটা অশরীরী মায়ের জন্য।

সত্যি কথা বলতে কী’ মা, আমার জীবিত ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। তারপরও আল্লাহ্ যদি আমাকে বাঁচিয়ে রাখে, দেখা হবে পাক-হায়েনামুক্ত খোলা আকাশের নিচে । স্বপ্নের স্বপ্নিল আরাধনায়। নতুন এক বেশে । স্বাধীন পতাকার নিচে আমরা সবাই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে ধরে থাকব ।

লুনাকে নিয়ে আমি তেমন কিছু বলব না । তুমি যদি পারো ওকে একটু বুঝিয়ে বলো। আমার সন্তান দুইটিকে তুমি দেখে রেখো। আবারও তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আল্লাহ্ যদি বাঁচিয়ে রাখে দেখা হবে বিজয়ে ।

তোমার বাজান

পুনশ্চঃ না। আজাদ আর কখনোই ফিরে আসেনি। হানাদারমুক্ত স্বাধীন বাংলা তাঁর আর দেখা হয়নি। খবরটা শোনার পর তাঁর মা ০৭ দিন বেঁচেছিল, অতঃপর। আজাদ শহীদ হওয়ার আগে একাই বেশ কিছু পাকিস্তানি হানাদার মেরে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। তারই পরিণামে আজাদের বাড়িতে হানাদাররা পৈশাচিক আক্রমণ চালায়। আজাদের বৃদ্ধ বাবাকে গাছের সাথে ঝুলিয়ে বিবস্ত্র  করে ফাঁসি দিয়ে মেরে ফেলা হয়। আজাদের দুই সন্তানকে বুটের নিচে পিষ্ট করে হত্যা করা হয় এবং আজাদের বোন শিউলি ও স্ত্রী লুনাকে হানাদাররা তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পরের দিন তাদের নিতম্বের মধ্য দিয়ে বাঁশ ঢুকিয়ে গাল দিয়ে বের করা ক্ষত-বিক্ষত লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায় নদীর ধারে ।

ওপরের সব চরিত্রই প্রতীকী হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে কিন্তু স্বাধীন বাংলার পেছনের ইতিহাস এর চাইতেও ঢের করুণ । হাজারো আজাদ, হাজারো বাবা-মার চোখের জলের বিদীর্ণ পথ পেরিয়ে, লক্ষ শিউলি আর লুনার সম্ভ্রমের দামে কেনা আমার এই স্বাধীন বাংলা। এত মহানুভবতা, এত আবেগের জলাঞ্জলি, এত রক্তের দামে কেনা এই স্বাধীন বাংলাদেশ, আমরা যারা এখনও পরাধীন করে রেখেছি কব্জির জোরে অথবা নিজের স্বার্থের তিয়াসা মেটানোর জন্য—আমরা মোটেও হানাদারদের চরিত্রের বাইরের কোনো চরিত্র আজ অবধি হতে পারিনি ।

১১ ০১ ১৬

চার দেয়ালের নীল | কালোত্তীর্ণ চিরকুট | মুহাম্মাদ ইমরান | Char Deoaler Neel | Muhammad Imran |

সর্বান্তকরণ আবেগের মাঝেই অবুঝ প্রেমের বসবাস। আবেগকে প্রশমিত করে ভালোবাসার  ঝাণ্ডা তুলে ধরা মোটেও সহজসাধ্য নয়। ভালোবাসার  অনন্যসাধারণ বোধসমূহের যথার্থ মূল্যায়ন করেই যে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ানো যায়, তারই যথার্থতার প্রকাশ—জেলখানার কয়েদি মেহেদী হাসান নীলের কাছে লিখা ইসরাত জাহান আশার একখানা জীবনবাদী পত্র ।

নীল

দুর্নিবার কোনও আকর্ষণ আমার স্বাভাবিকতায় অথবা স্বপ্নিল আরাধনায় হানা দিতে পেরেছে কি না মনে পড়ে না । অঝরে কারও জন্য একাকী কেঁদেছি নাকি তাও বলা মুশকিল । কারও প্রতি অতিশয় আসক্তির চেতনা আমাকে কখনো শাসন করতে পেরেছে কি না তাও বোধ করি আমিই জানি না । সোজা কোথায় তোমার প্রতি সামান্যতম আনুগত্য কোনও কালেই আমার ছিল না তবে আমাকে পাওয়ার জন্য তোমার অমানুষিক পরিশ্রম’ আমার হৃদয় গহীনে যে একেবারে দাগ কাটেনি তাও বলা যাবে না । কিন্তু সেই হাড়ভাঙ্গা শ্রমের বিনিময়ে তুমি আমার কাছ থেকে যা নিয়েছ তাকে আর যাই হোক ভালোবাসা বলা যাবে না । একজন নাছোড়বান্দা ভিখারিকে ভিক্ষা দেওয়া অথবা শ্রমের বিপরীতে পারিশ্রমিকের নামে করুণা দেওয়া বলাই ঢের শ্রেয়।

খুব ছোটবেলা থেকেই আমি নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করি। নিয়মের দেওয়ালগুলো কখনোই আমার কাছে অনিয়ম হতে পারেনি। আমি যখন মায়ের সাথে শিল্পকলায় গান শিখতে যেতাম, তুমি বিনা কারণেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাকে এক নজর দেখার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে, বিশ্বাস করো একটি দিনও আমি ভাবিনি ওই মানুষটা কেন আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে ?

আমাদের বাড়ির সামনের আম গাছটায় তাবিজ ঝুলানো দেখতাম; ওই দেখা পর্যন্তই । আমি বুঝতাম কিন্তু তাবিজ কে রেখেছে তা নিয়ে কোনো বিশেষ ঝোঁক আমার হৃদয়ের চিলেকোঠায় পরিলক্ষিত হয়নি। নারকেল গাছ বেয়ে তুমি রাত-বিরাতে আমাদের চালের ওপর বসে থাকতে শুধু আমাকে এক নজর দেখার জন্য । চালের উপর ঘুমিয়ে থাকার জন্য একদিন আমাদের বাড়ির লোকজন তোমাকে  অনেক মারধর করল। পরে জানা গেলো অনেকগুলো ঘুমের বড়ি খাওয়ার জন্য তুমি আনমনে চালের উপরই তন্দ্রার ঘোরে হারিয়ে গিয়েছিলে । বেধড়ক পেটানোর জন্য তোমার বাম হাতটা ভেঙ্গে গিয়েছিল এবং তুমি সেই ভাঙ্গা হাতের ব্যান্ডেজ পরিহিত অবস্থায় আমার সামনে দিয়ে ঘুরঘুর করতে । উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার কিন্তু আমি আরও বিরক্ত । ওই মুহূর্তে করুণা  তো দূরের কাব্য, এক ফালি ঘৃণিত বোধের সঞ্চারণও তুমি করতে পারোনি  ।

আমার সুশৃঙ্খল জীবনটা অতিষ্ঠ করে দিয়েছিলে তুমি। কলেজের সামনে একদিন আমাকে তুমি কি যেন কী বলতে চাইলে; আমি দৌড়ের মতো করে হাঁটতে শুরু করলাম । আমার মা অনেক বন্ধুদের সামনে তোমার গালে কসে থাপ্পড় মারল । তোমার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল, তুমি কোনো কথা বলোনি তবে তোমার অশ্রুর অন্তর্যামী ভাষা বুঝে নিতে আমার দেরি হয় নি। এই প্রথম তোমার বিষয়টা আমাকে খানিকটা স্পর্শ করল। তোমার আবেগ, পুঞ্জিভূত কিছু অভিমান এবং অভিযোগের অশ্রু আমাকে বিচলিত করতে সক্ষম হলো। তবে তোমার সেই বাঁধভাঙা চোখের জল আমার করুণার দেওয়াল টপকাতে পারেনি ।

এভাবেই চলছিল আমাদের দিনকাল । ইতিমধ্যে তুমি বেশ কয়েকবার মেট্রিক পরীক্ষায় ফেল করলে আর আমি গোল্ডেন এ প্লাসসহ ইন্টারমিডিয়েট শেষ করলাম সুতরাং দিন কে দিন পরিস্থিতি তোমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে লাগল । কলেজে পড়া অবস্থায় মাসুদ রানা নামক একটা বাবুগোছের ছেলের সাথে আমার যৎসামান্য সম্পর্ক হয়েছিল । সত্যি কথা বলতে কী এই সম্পর্কের ব্যাপারটায় মাসুদের তেমন কোন ভূমিকা ছিল না উপরন্তু আমিই তাকে অনেকটা জোরপূর্বক রাজি করিয়েছি । আমি জানি তুমি কষ্ট পাচ্ছ ।  না নীল, কষ্ট পাওয়ার তেমন কিছু নেই । এটাই ঢের বাস্তবতা এবং ধ্রুব সত্য ।

মানুষ তার নিজের ইচ্ছাতে প্রেমে পড়তে পারে না । এটা আনমনে, বেখেয়ালে অথবা হেয়ালির ছলে একাকী হয়ে যায় । সমস্ত নিয়মের বলয় ভেঙ্গে অপরিপক্ক বোধসমূহের ছোট ছোট কিছু ভুলের মাঝেই এই প্রেমের বসবাস। এটি হতে পারে একটা মানুষের সর্বোত্তম আবেগের এবং সর্বান্তকরণ ক্ষমার অদ্ভুত এক বহিঃপ্রকাশ । প্রেম কেমনে হয়, কে করায়, কে মধ্যস্থতা করে, কে এর লাটাই ঘুরায় তা জানার সময় কই বরং তাঁর মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকার প্রশান্তি নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকতে পারে অনাদিকাল অথবা মরে যেতেও যেন তাঁর কোনো বাধা নেই ।

খুব সহজ করে বলতে গেলে, আমাকে তোমার কেন ভালো লেগেছে তা যেমন তুমি জানো না; ঠিক মাসুদ রানাকে ভালো লাগার কোনও যৌক্তিক কারণ আমার কাছে আপাতত নেই । তবে মাসুদের প্রতি আমার দুর্বলতার প্রকাশ একেবারেই সামান্য । সে মোটেও আমার চিন্তার ধারাপাতে কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি । তাকে আমার ভালো লাগত কেবল এতটুকুই । যখন শুনলাম মাসুদ বিবাহিত, আমার মনটা একটু খারাপ হলো কিন্তু আমি তাকে প্রতারক ভাবিনি কারণ দোষটা আমারই ।

আমার সাথে স্পষ্ট করে তুমি কথা বলতে পারতে না । তোতলাতে আর যা বলতে তা কি ফ্রেঞ্চ নাকি হিব্রু তা নিয়ে আমি সন্দিহান থাকতাম অথচ আমি শুনেছি তুমি নাকি চমৎকার গান করো এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নান্দনিক উপস্থাপনা করো।

সেই তুমি বেশ সাবলীলভাবে একদিন আমাকে ফোন করে জানিয়ে দিলে তুমি আমাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে চাও । আমি তোমাকে মোটেও ভালোবাসতাম না এটা সত্য কিন্তু বিশ্বাস করো আমি বোধ হয় তোমার ওই প্রস্তাবটার জন্যই বসে ছিলাম কারণ আমি এটা বুঝতাম, আমার তাকেই বিয়ে করা উচিত যে আমাকে ভালোবাসে । যাই হোক, আমি বীরাঙ্গনা বেশে তোমার হাত ধরে পালিয়ে গেলাম ।

আমরা বোধ হয় এক মাস একসাথে ছিলাম । তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসো, সন্দেহাতীতভাবে তা প্রমাণিত। কিন্তু ভালোবাসাই যে সর্বশেষ কথা নয় এবং এটি আবেগের চাদরে মোড়ানো কয়েকটি বর্ণ মাত্র, এই প্রথম শরীর এবং হৃদয়ের দামে আমি তা বুঝে নিলাম । একটি টাকাও তোমার কাছে নেই, ভরসা কেবল চুরি করে আনা আমার মায়ের গহনা সকল । তোমার সাথে আমার কিছুই মিলছে না। আমি পরিপাটি, মার্জিত বোধের দাস আর তুমি অগোছালো, নোংরা, মাদকাসক্ত, গালি ছাড়া কথা বলতে পারো না কেমন যেন বস্তির উদ্বাস্তু জীবনের চিত্র তোমার মধ্যে বহমান । আমি বড় বিপদে পড়ে গেলাম ।

ইতিমধ্যে আমার বাবা-মা পাগলের মতো আমাকে খুঁজে-ফিরছে । তোমার নামে গোটা দশেক মামলা রুজু  করা হলো । আমার বাবা অনেক প্রভাবশালী এবং শিল্পপতি হওয়ায় তুমি খুব ভয় পেতে । পুলিশ তোমাকে ধরে নিয়ে গেলো এবং তারপর থেকে তুমি এখন অবধি জেলেই আছ । তোমার হতদরিদ্র বাবা-মার সাথে আমার কথা হয় । তারা তোমার জামিন করানোর জন্য আমার কাছে অনেকবার এসেছে। আমিও বিরামহীন চেষ্টা করে যাচ্ছি  কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। আমার বাবা-মার সাথে এখন আমার কোনও সম্পর্ক নেই । প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করছি । ওপরের ঠিকানায় আছি ।

না। আমি তোমার কাছে আর ফিরে যাব না এবং আমি তোমাকে একতরফাও দিয়ে দিয়েছি। নীল, শুধু ভালোবাসা আর আবেগের মূর্ছনা দিয়ে সংসারের বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়াটা কঠিন । তবে তুমি আমার জন্য সারাজীবন যে অমানুষিক নির্যাতনের স্বীকার হয়েছ তা ভেবে আমি কষ্ট পাই ।

কি না করেছ তুমি আমার জন্য ! আমি তোমাকে ভালোবাসতে পারিনি সত্য কিন্তু তারপরও তোমাকে আমার লক্ষ্মী, সোনা, মানিক বলতে ইচ্ছা করছে। তোমার এতিম, অবুঝ ভালোবাসাকে প্রণাম না জানালে যে ভালোবাসাকেই অপমান করা হবে। আমি বাস্তববাদী তবে ভুলের ঊর্ধ্বের কেউ নয়। আশা করি আমাকে ক্ষমা করবে। নিঃশর্ত ক্ষমা !

তোমার আশা

বেশ আছি | মুহাম্মাদ ইমরানের কবিতা | Besh Achi | Muhammad Imran |

এই তো আছি ভালো, বেশ !
চাওয়া–পাওয়ার
নেই কোনো হিসেব–নিকেশ ।
আকাশপানে রাত-দুপুরে
খুঁজতে হয় না কোনো তারা
ঘুমের ঘোরে স্বপ্নরা আর
ইশারায় দেয় না কোনো সাড়া ।

মাথার সিঁদুর হয়ে ছিলে যতকাল
পারিনি বুঝতে আমি সকাল আর বিকাল ।
কোথায় ছিল চিরসবুজের স্নান
গতরের ময়লা গতরেই ছিল
সুগন্ধি সাবানের ছিল কী কোনো দাম ?

ভাবতে হবে না আর কেউ আছে
আমার সাথে যুক্ত
প্রয়োজন হবে না রাখার
তাঁর অবুঝ শত আবদার
আমা ভিতরের আমিরে’ করে দিয়েছি মুক্ত ।

শাশ্বত, আমি মহানায়ক
অম্লান সবুজে গাঁথা এক প্রাণ
অনিঃশেষ ভালোবাসায়, নুয়েপড়া শ্রদ্ধায়
বলতে হবে না’ আর তাঁরে ‘জান’ ।।


১১ ১১ ১৬

এবার  তবে মুক্তি দাও | মুহাম্মাদ ইমরানের কবিতা | Ebar Tobe Mukti Dao | Muhammad Imran |

অনেক হয়েছে। এবার মুক্তি দাও।
অনেক সয়েছি। এবার ছেড়ে দাও ।
হুম, আমি জানি আমি ভুল করেছি।
ভুল অমানুষকে ভালোবেসে
ভুল আত্মাকে কাছে টেনে ।

না না’ আমার কোনো  আপত্তি নেই।
আমার কখনো কেউ ছিল না
এখনো কেউ নেই ।
তোমাদের এই রঙ্গমঞ্চের
আলাদা একটা ভাষা আছে
তোমাদের যাপিত সমাজ ব্যবস্থার
অভিন্ন একটা রূপ আছে ।

রূপটা স্বার্থের তাগাদা পূরণের
হাসিমুখে অনর্গল মিথ্যা বলার
গরীবের পয়সা চুষে নেওয়ার
নিশিদিন ভালো মানুষের অভিনয় করার ।

তোমাদের চরিত্রের বাইরে
আরও একটি চরিত্র বিদ্যমান;
কাম তার নাম অথবা যৌনতা
শাড়ির মাঝে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার
স্বতঃস্ফূর্ত প্রবণতা নচেৎ মদ্যপান ।

মানতে কোন বাধা নেই, তোমরা যোদ্ধাজাতি
তোমরা বীর, বীর মুক্তিযোদ্ধা ।
জীবন্মৃত সব বাঙলা প্রাণীর হুঙ্কার
তোমরা ১৬ কোটি বাঙালির দম্ভোক্তি
আত্মিক প্রশান্তি, চূড়ান্ত অহঙ্কার ।

আবার তোমরা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাও
মাসিক ভাতা খাও
তাকবিরুল্লাহর সহিত
০৫ ওয়াক্ত নামাজও পড়ো  
কথায় কথায় ৭১ এ ফিরে যাও ।

মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও
হয়েছ তুমি আগুয়ান
হানাদার ধ্বংস করতে
তুমি পিছপা হওনি মোটেও
অকুতভয় জাওয়ান ।
রাইফেল বইবার ক্ষত
এখনও তোমার কাঁধে অক্ষত ।

বানিয়ে বানিয়ে কী সুন্দর গল্প সাজাও
দাদীমার রূপকথার ঝুলিকেও হার মানাও ।
বাটপারও তোমার কাছে মেনেছে হার
৩০% কোটা ছাড়া কী হতো না তোমার ?
ওহে ভণ্ড, গর্বিত জানোয়ার
কোন ভূষণে সাজবে তুমি
কোন কাফনে বাঁধবে তুমি
জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, বীর কুলাঙ্গার ।

ও’ দুবাই ফেরত কম্বলওয়ালা !
দেখা হয়েছি কী কখনো
চাঁদের নিচে লুকানো
টার্মিনালে কুচিমুচি হয়ে
শুয়ে থাকা বুড়ির’ থর থর কাঁপন
দেখা হয়নি বুঝি, টুকাই আর কুকুরের
গলাগলি ধরি, অভিশাপের
রাত শেষ না হওয়ার রাত্রি যাপন ।

পার্থক্য কোথায় জানতে চাই
তাঁরা কী তোমাদের থেকে
আলাদা কিছু ভাই ।
হুম ! তাঁরাও মানুষ তবে শুধু দেখতে
সাহিত্যিকের ভাবনা জুড়ে
পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠা ভরে
কোটিপতির ০৬ তলার পরে
দৃষ্টিকটু একটি ছোট
ছোনের ঘরের তরে ।

অনেক তো হলো এবার দাও যেতে  
এত সংক্ষিপ্ত পরিসরে
কেবলই নিজকে নিয়ে
পড়ে থাকার কলেবরে
কী চাও অভাগার দল খামাখা
দৃষ্টি জুড়ে তোমাদের টিআর,
রিলিফের চাল আর কাবিখা ।

তোমাদের কী অসুখ করে না, তোমরা কী মৃত্যুহীন প্রাণ ?   
রোজ হাশরের ময়দানে দাঁড়াবে না তুমি, সন্মুখ রহমান ?


১৯ ১০ ১৬

আমার একটা বদভ্যাস আছে | মুহাম্মাদ ইমরানের কবিতা | Amar Ekta Bodovvas Ache | Muhammd Imran |

আমার একটা ভয়ংকর বদভ্যাস আছে
দুপুর এলেই আমি
এলিয়ে দুলিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।

কিন্তু আজ ঘুম নামক ছলনার প্রশান্তি
তার সহজাত তাণ্ডব চালাতে পারেনি
নির্লজ্জ, বেহায়ার মতো বহুক্ষণ
আমি অবাক হয়ে বসে ছিলাম !

অনেক ক্ষমতা তোমার, না !
কী করতে পারো তুমি ?
অকর্মা, অথর্ব, হতচ্ছাড়া
কোনো বেকারকে
ভুল করে একটা ভুল স্বপ্ন
দেখাতে পেরেছ ?

সবুজ-অবুঝ, ন্যায়ের বাণে,
অন্যায়ের তোপে
তোমাকে কোথাও পাওয়া যায় না ।

সৃষ্টি, দৃষ্টি, বৃষ্টি, অনাচার, অত্যাচার,
হত্যায়, লোভে, ক্রোধে, ভুলের ভুলে,
গরিমায়, গৌরবে, ত্যাগে—
কোথায় আছ তুমি, বলো তো দেখি ?

সূর্যের আলো দেওয়া কী বন্ধ হয়ে গেছে ?
চাঁদের অল্পস্বল্প আলোর মূর্ছনায়
নবদম্পতির নয়নাভিরাম
মাদকাসক্ত ঢলাঢলি কী থমকে গেছে ?

কই খুনোখুনি তো বন্ধ করতে পারোনি
এমনকি চুরুটের শেষ টানের সুখটা
পর্যন্ত রুখতে পারো নি,
শুধু পেরেছ, আমার মতো একটা
নির্ভেজাল অপদার্থর সাথে ।


১৯ ০৪ ১৬