বাবা মানে—বাজান, খোকা, খোলা আকাশ একটা মানবের অভিন্ন বোধের দ্বৈত প্রকাশ । বাবা মানে—সম্পদ, বটবৃক্ষ, ক্রমাগত আবদার অনধিকার চর্চার এক বিশাল ভাণ্ডার ।
বাবা মানে—স্বপ্ন এবং স্বপ্নিল ফানুস বাবা মানে—আমি এবং আমার নিজ জগৎ বাবা মানে—সহযাত্রী, সহযোদ্ধা, আমার পুঞ্জিভূত বিশেষ শক্তি লাঠি, বৈঠা, হাতিয়ার আমার শেষ স্পর্ধা ।
বাবা মানে—এই বুঝি এলো বাবা ভয়, আতংকের যন্ত্র বাবা মানে—নিজের অপরাধী সত্তা দমন করার মন্ত্র । বাবা মানে—একটা গোটা দুনিয়া আমার সুখে তাঁর সুখ হয়ে ওঠার তন্ত্র ।
বাবা মানে—সুখ, শ্রান্তি, প্রতিশ্রুতি কথায় কথায় আমার’ সম্বোধনের প্রশান্তি । বাবা মানে—আমার সোনাপাখি, জাদুমণি বারংবার ছলাকলায় আব্বা’ বলার কথন আমার কলজের টুকরা, পিতলা ঘুঘু, টিয়া, ময়না-বাবুটার’ অনবরত আয়োজন ।
বাবা মানে স্বাদ-আহ্লাদ পূরণের মাতুব্বরি বাবা মানে পুরো পৃথিবীটাকে নিজের করে ভাবার দুঃসাহসিক তালুকদারি ।
বাবা মানে স্বাধীনতা, নিশ্চিত ক্ষমা, প্রহরী অতন্দ্র বাবা মানে দ্ব্যর্থহীন, স্বার্থহীন আশ্রয়কেন্দ্র ।
বাবা মানে সাহস’ শব্দটার সর্বান্তকরণ বহিঃপ্রকাশ বাবা মানে আমার আমি, আমিত্ব, অধিকার নিজ বোধের বহুমাত্রিক রূপকার ।
বাবা মানে ‘আল্লাহর নেয়ামত’ আবদার পূরণের ভাণ্ডার কথা কবে রক্ত, ভাবনা কী আর ?
এই চিঠি পাওয়ার পর তুমি একটি বিয়ে করে নিও। আমি অনুমতি দিলাম। আমার মৃত্যুর বাকী আর ৭০ মিনিট ১৫ সেকেন্ড। আমি ভালো আছি। আমার কোনও দুঃখ নেই। তবে আমাকে ফাঁসি দেওয়ার কারণটা যদি জানতে পারতাম, সেটি আরও ভালো হতো। আমাকে কেন রাজাকার বানিয়ে দেওয়া হলো—প্রাপ্তবয়স্ক এই প্রশ্নের সদুত্তর জানার বড় ইচ্ছে ছিলো। তাই বাধ্যতামূলক আফসোস নিয়েই চলে যেতে হচ্ছে ।
আমি মসজিদে ইমামতি করতাম। যুদ্ধে গেলে মুসল্লিদের কে নামাজ পড়াবে এই ভেবে ভেবে, আমার আর যুদ্ধে যাওয়া হলো না। কিন্তু বিশ্বাস করো—গিয়াস, তপন, করিম মোল্ল্যা, সাত্তারসহ অনেক সশস্ত্র যোদ্ধাই আমার বাড়িতেই রাত্রি যাপন করত। প্রতিদিন রাত্রে ওদের সকলের খাওয়ার ব্যবস্থা আমিই করতাম। তপন ও গিয়াসের বাড়িতে পাকবাহিনী দুই দুইবার হামলা করেছে, দুইবারই আমি তপন ও গিয়াসের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছি। উর্দুতে কথা বলে আমি নিজেকে উজাড় করে দিয়ে তপন ও গিয়াসের পুরো পরিবারকে রক্ষা করেছি। আমার বাড়িতে গোপনে মুক্তিসেনাদের থাকা-খাওয়ার বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিবার লক্ষ্যে–আমাকে বেধে, পুরুষাঙ্গে বাটখারা ঝুলিয়ে, চান্দু খুনকার পাক আর্মিদের সাথে নিয়ে আমার ছোট বোনকে তুলে নিয়ে যায়। পরের দিন বস্তাবন্দী ফাতেমার বিবস্ত্র ও বিক্ষিপ্ত লাশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সেই চান্দু খুনকার এখন মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় । আশ্চর্য বিষয় হলো, চান্দু খুনকারই আমাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং অতি অলৌকিক ঘটনা হলো—যার পুরো পরিবারকে আমি রক্ষা করেছিলাম সেই গিয়াস আমার বিরুদ্ধে খুন ও ধর্ষণের অভিযোগের সাক্ষী দিয়েছে । জজ সাহেব আমাকে জিগ্যেস করেছে আপনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য কী না—আমি চান্দু খুনকার আর গিয়াসের চোখের দিকে তাক করে বলেছি, সব সত্য । পৃথিবীতে যত খুন ও ধর্ষণ হয়েছে—সব আমি একাই করেছি ।
যদিও প্রচণ্ড ঘৃণা আর অভিমান থেকে আমি বলেছি ‘সত্য’ তবে অভিযোগ অস্বীকার করলেও রায়ের কোনও পরিবর্তন হতো না। রায়, জজ সাহেব আগে থেকেই লিখে নিয়ে আসছে। পাক আর্মিদের নারী সাপ্লাই দেওয়া চান্দু খুনকার যদি আমাকে রাজাকারের খেতাব দেয়, সেখানে আমার সত্য-মিথ্যা দিয়ে আর কীই-বা হবে বলো ?
বাস্তবতা আমি মেনে নিয়েছি। আমার হাতে বেশি সময় নেই। তোমাকে অভাব, অনটন আর অভিযোগ ছাড়া আমি কিছু দিতে পারি নি। আমাকে ক্ষমা ভিক্ষা দিও। মার কথা একটু বেশি মনে পড়ছে। তার ছেলের ফাঁসি ! মা এটা কীভাবে মেনে নিবে ? এসব ভেবে আমার মাথা ক্রমশ নত হয়ে আসছে । তুমি বিয়ে করার পর আমার মাকে তোমার সাথে রেখো। এটা আমার আদেশ ।
আমার একটা মাত্র মেয়ের জন্যও কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। ব্যাপারটা দুঃখজনক। আমার টাকাপয়সা নেই। আমার মূলধন ছিল সততা। সেটিও বিক্রি হয়ে গেলো। সবাইকে তুমি দায়িত্ব নিয়ে বলো—আমি মান্নান, যুদ্ধাপরাধী নই। আমার বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা অভিযোগকে সত্য বলা ছাড়া আমি জীবনে একটা মিথ্যা কথাও বলি নি। খুন তো দূরের কথা আমি জীবনে কাউকে একটা চড়-থাপ্পড়ও দেইনি। ধর্ষণের অপবাদটা আমাকে আলাদাভাবে ব্যথিত করে তুলছে। খাদিজা তুমি তো ভালো করেই জানো, মেয়ে মানুষ দেখলে আমি মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতাম। সেই আমাকেই।
১০ ফুট বাই ৬ ফুটের এই কনডেমড সেলে থাকতে থাকতে কেমন যেন আমি প্রতিবন্ধীর মতো হয়ে গেছি। ফাঁসিতে ঝুলে পড়াটাই এই মুহূর্তে আমার কাঙ্খিত জয়ের সমান। জীবন, বেঁচে থাকা, নির্মোহ মমতা—কোনও কিছুকেই আমার আর নিজের বলে মনে হচ্ছে না। কেবল আসন্ন মৃত্যুকেই মনে হচ্ছে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি ।
বড় সাধ ছিল তোমার স্পর্শে জীবনের মানে বোঝার; সাধ ছিল তোমার কবুল বলার ভঙ্গিটা দেখার ।
সাধ ছিল চাঁদকে সাথে নিয়ে সারারাত ডিঙ্গি নৌকায় ঘুরে ফেরার, জ্যোৎস্নার আলোকে জিম্মি করে মুদ্রাহীন ছন্দের তালে তালে ঢলাঢলি করার ।
সাধ ছিল পুরোদস্তুর স্বপ্নাতুর বনে যাবার অধরা স্বপ্নের খুব কাছাকাছি চলে যাবার । সাধ ছিল ভালোবাসাকে চেটেপুটে খাওয়ার, আকস্মিক চুম্বনে তোমার ঘর্মাক্ত লালা শুষে নেওয়ার ।
সাধ ছিল একটি সন্তান, কন্যা সন্তান; দেখতে তোমার মতো হবে, আমার অনুভূতির মাস্তান । সাধ ছিল তোমার মুখ থেকে ঘন ঘন ‘এই শুনছো’ শুনার।
উচ্চাভিলাষী বিরামহীন ঝগড়া শেষে দুজন দু’কাত হয়ে ঘুমের ভান করে সারানিশি চোখ বড় করে চেয়ে থাকার ।
একটি দোতলা বাড়ি, একটি ছোট সংসার দুজন মিলে একটি জীবন, আবহ চমৎকার । বড় সাধ ছিল শিশুতোষ ভালোবাসায় তোমাকে আগলে রাখার, নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়ে তোমাকে নির্মাণ করার।
অনেক হয়েছে। এবার মুক্তি দাও। অনেক সয়েছি। এবার ছেড়ে দাও । হুম, আমি জানি আমি ভুল করেছি। ভুল অমানুষকে ভালোবেসে ভুল আত্মাকে কাছে টেনে ।
না না’ আমার কোনো আপত্তি নেই। আমার কখনো কেউ ছিল না এখনো কেউ নেই । তোমাদের এই রঙ্গমঞ্চের আলাদা একটা ভাষা আছে তোমাদের যাপিত সমাজ ব্যবস্থার অভিন্ন একটা রূপ আছে ।
রূপটা স্বার্থের তাগাদা পূরণের হাসিমুখে অনর্গল মিথ্যা বলার গরীবের পয়সা চুষে নেওয়ার নিশিদিন ভালো মানুষের অভিনয় করার ।
তোমাদের চরিত্রের বাইরে আরও একটি চরিত্র বিদ্যমান; কাম তার নাম অথবা যৌনতা শাড়ির মাঝে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার স্বতঃস্ফূর্ত প্রবণতা নচেৎ মদ্যপান ।
মানতে কোন বাধা নেই, তোমরা যোদ্ধাজাতি তোমরা বীর, বীর মুক্তিযোদ্ধা । জীবন্মৃত সব বাঙলা প্রাণীর হুঙ্কার তোমরা ১৬ কোটি বাঙালির দম্ভোক্তি আত্মিক প্রশান্তি, চূড়ান্ত অহঙ্কার ।
আবার তোমরা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাও মাসিক ভাতা খাও তাকবিরুল্লাহর সহিত ০৫ ওয়াক্ত নামাজও পড়ো কথায় কথায় ৭১ এ ফিরে যাও ।
মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও হয়েছ তুমি আগুয়ান হানাদার ধ্বংস করতে তুমি পিছপা হওনি মোটেও অকুতভয় জাওয়ান । রাইফেল বইবার ক্ষত এখনও তোমার কাঁধে অক্ষত ।
বানিয়ে বানিয়ে কী সুন্দর গল্প সাজাও দাদীমার রূপকথার ঝুলিকেও হার মানাও । বাটপারও তোমার কাছে মেনেছে হার ৩০% কোটা ছাড়া কী হতো না তোমার ? ওহে ভণ্ড, গর্বিত জানোয়ার কোন ভূষণে সাজবে তুমি কোন কাফনে বাঁধবে তুমি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, বীর কুলাঙ্গার ।
ও’ দুবাই ফেরত কম্বলওয়ালা ! দেখা হয়েছি কী কখনো চাঁদের নিচে লুকানো টার্মিনালে কুচিমুচি হয়ে শুয়ে থাকা বুড়ির’ থর থর কাঁপন দেখা হয়নি বুঝি, টুকাই আর কুকুরের গলাগলি ধরি, অভিশাপের রাত শেষ না হওয়ার রাত্রি যাপন ।
পার্থক্য কোথায় জানতে চাই তাঁরা কী তোমাদের থেকে আলাদা কিছু ভাই । হুম ! তাঁরাও মানুষ তবে শুধু দেখতে সাহিত্যিকের ভাবনা জুড়ে পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠা ভরে কোটিপতির ০৬ তলার পরে দৃষ্টিকটু একটি ছোট ছোনের ঘরের তরে ।
অনেক তো হলো এবার দাও যেতে এত সংক্ষিপ্ত পরিসরে কেবলই নিজকে নিয়ে পড়ে থাকার কলেবরে কী চাও অভাগার দল খামাখা দৃষ্টি জুড়ে তোমাদের টিআর, রিলিফের চাল আর কাবিখা ।
তোমাদের কী অসুখ করে না, তোমরা কী মৃত্যুহীন প্রাণ ? রোজ হাশরের ময়দানে দাঁড়াবে না তুমি, সন্মুখ রহমান ?
নাতিদীর্ঘ ছোঁয়ায় কেমন যেন ছিলে অতিদূর চুম্বনেও শক্তপোক্ত ছিলে । ধরিত্রীর মাঝে আমি ছিলাম অবমুক্ত ধাঙড় তোমাকে বিমুগ্ধ রাখাটাই ছিল যার সমবেত অহংকারের নোঙর ।
ছিলে আমার ঠাকরুন ছিলে আমার পূজার রসদের ব্যঞ্জন । আমি তোমার সৌন্দর্যের পোষা কুকুর ছিলাম আমি তোমার একনায়কতান্ত্রিক ষড়যন্ত্রের মন্ত্রমুগ্ধ বানর ছিলাম । কী ছিলে না তুমি আমার ? আমার দেমাগ ছিলে তুমি হাড় কাঁপানো শীতের’ মোটা কম্বল ছিলে তুমি ।
আপাতত আমি, রঙিলা রূপবান। আমি উন্মুক্ত, মুক্ত বিহঙ্গ, কেউ নেই আমার আমি প্রমত্ত সাগর, চলি বহমান । আমার নাম এখন ‘ছুটি’ কুটিল ভূমে ঘুরেফিরি দিনমান ।
আমি এখন নিজেই একটা সুখের পুটলা তুমি কোথায় থাকো, কোথায় তোমার ঘর কোন বেটার বুকের দুর্গন্ধ শুঁকো না আবার ঘুমের ভান ধরে থাকো কী করো, কী করো না, কই আছ, কেমন আছ ওসব নিয়ে, নেই আমার কোনো জটলা ।
আমি চিৎকার করে বলতে চাই আমি শান্তিতে আছি । মহাকালের পর তথাকথিত এক ‘শান্তি’ । আমি চিৎকার করে বলতে চাই আমি স্বস্তিতে আছি বহু পুরাণের পর তথাকথিত এক ‘স্বস্তি’ ।
শ্রাবণের কান্নাভেজা রাতে চৌত্রের খরতাপে মিশে গোধূলির বিষণ্ণ বেলায়’ ফিরে এসো ফিরে এসো শরতের এক স্নিগ্ধ সকালে আয় ফিরে আয় বসন্ত’ আর একটিবার দাও দাও দাও মরণের অধিকার ।
কাকডাকা ভোরে নয় তো ঘোর তিমিরে উদাস দুপুরে ফিরে আসো ফিরে এসো সন্তানহারা মায়ের চোখের জলে বেয়ে ।
আমি রাখতে পারিনি তোমার মান লক্ষ্মী তুমি করো না অভিমান । আসবে তুমি আসবে সত্যি আবার ফিরে চার বেহারার পালকি আর কলেমার ধ্বনিতে ।
সুদখোরদের মতো নিমাইর গচ্ছিত কোনও টাকা নেই । কাম করলে খায়, কাম না করলে–? ১ বউ, ০২ কন্যা আর বুড়ো মাকে নিয়ে ওরা মোট ০৫ পেট । ০৫ পেটের কামাইছুত নিমাই একাই ।
বছর কুড়ি আগে আলীপুর মোড়ে নিমাই তাবিজ বেচত । আয়-রোজগার তখন মন্দ ছিল না ঠাকুরের দোকান থেকে মায়ের জন্য রসগোল্লাও আনা হতো অকস্মাৎ । তাবিজের চল উঠে যাওয়ায় নিমাই বছর কয়েক মাটি কেটেছে কয়েক-বসন্ত রাজমিস্ত্রির জোগালদারও ছিল ।
এতিম নিমাইর জগাই নামে এক ভাই ছিল ৭১ পরবর্তী সময়ে রক্ষীবাহিনীর হাতে ভিটেমাটিসহ জগাইকেও জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে ।
নিমাইর বড় মেয়ে ইলিশে মন্ত্রমুগ্ধ মাছবাজারের চারিপাশে নিমাই চোরের মতো ঘুরে । ইলিশের দর আর নিমাইর লুঙ্গির গোঁজ ভবেরহাটের দুই মেরুর অবস্থান ।
এখন নিমাই অটোভ্যান চালায় মহাজনের জমা দেওয়ার পরও ৩০০/৫০০ থাকে । ভালো খেতে না পারলেও ০৫ পেট চলে যায় । চলে যেতে হয় ।
করোনা বা লকডাউনের জুতসই কোনও সংজ্ঞা নিমাইর জানা নেই। বোধ হওয়ার পর থেকে নিমাইর একটাই মন্ত্র— কামলা দিতে পারলে ০৫ পেট চলবে নয়-তো ?
নিমাই কী ভ্যান চালায় না পেট চালায় তা ওর ভোঁতা মীমাংসায় ছোঁয় না । লকডাউনকালে নিমাই ১০০০ টাকা করে অদ্যাবধি ০৩ বার জরিমানা গুনেছে। নিমাই ক্ষীণ এবং হীন সুরে ম্যাজিস্ট্রেটকে অত্যল্প বোঝাতে চেষ্টা করেছে— করোনা, লকডাউন, মাস্ক, ঘরে থাকা, হাত ধোয়া, গাও ধোয়া সবই অধম মেনে নিবে; শুধু আমার ০৫ পেট ভরে দেবার নিশ্চয়তা দেন। ফলাফলঃ পুলিশের চড়-থাপ্পড়, পাবলিকের ট্যাক্সের টাকায় কেনা সরকারি বুটের পাইকারি লাথি এবং ম্যাজিস্ট্রেটের দস্তখতসহ ১০০০ টাকার জরিমানার স্লিপ ।
হরিপদ নামে নিমাইর এক স্কুল-মাস্টার বন্ধু আছে । হরিপদ নিমাইকে বলেছে— বিদেশে লকডাউনের সময় সরকার ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেয় । নিমাইর সরল কোরাস— গতর থাকতে পরেরটা আমার লাগবে না কিন্তু সরকার উল্টো ৩০০০/= নিয়ে নিলো, কেন ?
০১ জুলাই থেকে তীব্র লকডাউন চলছে দেখা মাত্রই গ্রেফতার ! গ্রেফতারের ডর নিমাই-অবধি পৌঁছানোর সুযোগ নেই ।
ভাবলেশহীন নিমাই ভ্যান নিয়ে বের হয়ে পড়েছে । চুরি-চামারি করে যদি দু-এক খ্যাপ মারা যায় ? কিন্তু আজ আর তা হলো না
পুলিশ এবং আর্মির যৌথ অভিযানে নিমাইকে আটক করা হলো । একই অপরাধ বারবার করায় নিমাইকে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ০৬ মাসের জেল দিয়ে দিলো ।
নিমাইর চোখেমুখে আন্ধার । ০৬ মাস না আমাকে ৬০ বছরের জেল দেন। আমি না আসা পর্যন্ত শুধু আমার বাড়ির ০৪ পেট ভরার ব্যবস্থা করে দেন । পুলিশ আর বসে থাকতে পারল না ? স্যারের সাথে বেয়াদবি ! মুখে মুখে তর্ক ! বানচোদ, শালা মালাউনের বাচ্চা বলতে বলতে এবং সমানে লাথি মারতে মারতে নিমাইকে গাড়িতে উঠিয়ে ফেললেন । নিমাইর অশ্রুকবলিত দুটি চোখে হরেক প্রশ্ন ? না-বলা অভিমানের স্তূপ ?
কমিশনার,ম্যাজিস্ট্রেট, মেয়র, ডিসি, সচিব, চিত্তশালী, বিত্তশালী, রক্ষণশীল, প্রগতিশীল, সুশীল, মোড়ল, কামলা, মাদবার, মৃদুভাষী, স্পষ্টভাষী, মন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং লিঙগহীন আন্দোলনপ্রিয় জনগণ— সবার কাছে নিমাইর অব্যক্ত আবেগের দ্ব্যর্থহীন এবং শর্তহীন প্রশ্ন— আমার অবর্তমানে আমার ০৪ পেটের দায়িত্ব নিবে কে ?
কী-রে একি তামাশা আজব জ্বর হয় আমার চেয়ে দেখি আমার চেয়ে বেশি জ্বর মার । ঘুম নেই মার চোখে একটু পরপরই তার বাজানের মাথায় হাত রেখে কী যেন কী দেখে ?
পরীক্ষায় ফাস্ট হলাম আমি খেলায়ও জিতলাম আমি অথচ ফাস্ট হলো মা কই জিতলাম আমি জিতলও যেন মা ।
মেলে না উত্তর ভাবি বসে নিরালা চারপাশে চালাকদের বুদ্ধি ফাঁদা দিগন্ত জুড়ে মানুষ-বেশে জানোয়ারের গাঁদা । এত ছ্যাঁচড়ের ভিড়ে কোন সে কারিগর এমন মা দিলো পরান ভরে ।
ওহ্ পেয়েছি পেয়েছি’ মা-তো আলাদা কিছু নয় অভিন্ন আত্মা, একই সত্তা নাড়িটাও যে ছিলো এক কোথা থেকে ধাত্রীবেটি এসে দিয়ে গেলো করে ফারাক ।
যদি বলি রুই মাছের মাথাটা আজকে কী খাওয়া যায় না, মা ? মার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে ভাবটা এমন, সে খেলে পৃথিবী ধ্বংসও হতে পারে । খেয়েছি, পরে খাব, আর একদিন খাব অথবা এমন কথা বলে না বাপ; সারাবছর সব মার-ই একই উত্তর । এভাবেই চলছে জনম দুঃখিনীর আয়ুষ্কাল এভাবেই চলছে মা-দের দিনকাল ।
চুপটি মেরে ভাবি বসে একেলা মা কেন এমন ? এমন স্বার্থ উদ্ধারের মিছিলে এই ভদ্র মহিলাকে কে পাঠালো, এই চির অভাগার তরে ?