বাবা মানে। মুহাম্মাদ ইমরানের কবিতা । Baba Mane Bangla Kobita . Kobi Imran .

বাবা মানে—বাজান, খোকা, খোলা আকাশ
একটা মানবের অভিন্ন বোধের দ্বৈত প্রকাশ ।
বাবা মানে—সম্পদ, বটবৃক্ষ, ক্রমাগত আবদার
অনধিকার চর্চার এক বিশাল ভাণ্ডার ।

বাবা মানে—স্বপ্ন এবং স্বপ্নিল ফানুস
বাবা মানে—আমি এবং আমার নিজ জগৎ
বাবা মানে—সহযাত্রী, সহযোদ্ধা,
আমার পুঞ্জিভূত বিশেষ শক্তি
লাঠি, বৈঠা, হাতিয়ার
আমার শেষ স্পর্ধা ।

বাবা মানে—এই বুঝি এলো বাবা
ভয়, আতংকের যন্ত্র
বাবা মানে—নিজের অপরাধী সত্তা
দমন করার মন্ত্র ।
বাবা মানে—একটা গোটা দুনিয়া
আমার সুখে তাঁর সুখ হয়ে ওঠার তন্ত্র ।

বাবা মানে—সুখ, শ্রান্তি, প্রতিশ্রুতি
কথায় কথায় আমার’ সম্বোধনের প্রশান্তি ।
বাবা মানে—আমার সোনাপাখি, জাদুমণি
বারংবার ছলাকলায় আব্বা’ বলার কথন
আমার কলজের টুকরা, পিতলা ঘুঘু, টিয়া,
ময়না-বাবুটার’ অনবরত আয়োজন ।

বাবা মানে স্বাদ-আহ্লাদ পূরণের মাতুব্বরি
বাবা মানে পুরো পৃথিবীটাকে নিজের করে
ভাবার  দুঃসাহসিক তালুকদারি ।

বাবা মানে স্বাধীনতা, নিশ্চিত ক্ষমা, প্রহরী অতন্দ্র
বাবা মানে দ্ব্যর্থহীন, স্বার্থহীন আশ্রয়কেন্দ্র ।

বাবা মানে সাহস’ শব্দটার সর্বান্তকরণ বহিঃপ্রকাশ
বাবা মানে আমার আমি, আমিত্ব, অধিকার
নিজ বোধের বহুমাত্রিক রূপকার ।

বাবা মানে ‘আল্লাহর নেয়ামত’
আবদার পূরণের ভাণ্ডার
কথা কবে রক্ত, ভাবনা কী আর ?

১৭ ০৫ ২০১৬

ফাঁসির মঞ্চ থেকে ইমাম সাহেব বলছি । মুহাম্মাদ ইমরান । Fasir Monch Theke Imam Saheb Bolci . Kobi Imran .

ফাঁসির আগে আব্দুল মান্নানের লেখা শেষ চিঠি

প্রিয়তমা খাদিজা

এই চিঠি পাওয়ার পর তুমি একটি বিয়ে করে নিও। আমি অনুমতি দিলাম। আমার মৃত্যুর বাকী আর ৭০ মিনিট  ১৫ সেকেন্ড। আমি ভালো আছি। আমার কোনও দুঃখ নেই। তবে আমাকে ফাঁসি দেওয়ার কারণটা যদি জানতে পারতাম, সেটি আরও ভালো হতো। আমাকে কেন রাজাকার বানিয়ে দেওয়া হলো—প্রাপ্তবয়স্ক এই প্রশ্নের সদুত্তর জানার বড় ইচ্ছে ছিলো। তাই বাধ্যতামূলক আফসোস নিয়েই চলে যেতে হচ্ছে ।

আমি মসজিদে ইমামতি করতাম। যুদ্ধে গেলে মুসল্লিদের কে নামাজ পড়াবে এই ভেবে ভেবে, আমার আর যুদ্ধে যাওয়া হলো না। কিন্তু বিশ্বাস করো—গিয়াস, তপন, করিম মোল্ল্যা, সাত্তারসহ অনেক সশস্ত্র যোদ্ধাই আমার বাড়িতেই রাত্রি যাপন করত। প্রতিদিন রাত্রে ওদের সকলের খাওয়ার ব্যবস্থা আমিই করতাম। তপন ও গিয়াসের বাড়িতে পাকবাহিনী দুই দুইবার হামলা করেছে, দুইবারই আমি তপন ও গিয়াসের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছি। উর্দুতে কথা বলে আমি নিজেকে উজাড় করে দিয়ে তপন ও গিয়াসের পুরো পরিবারকে রক্ষা করেছি। আমার বাড়িতে গোপনে মুক্তিসেনাদের থাকা-খাওয়ার বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিবার লক্ষ্যে–আমাকে বেধে, পুরুষাঙ্গে বাটখারা ঝুলিয়ে, চান্দু খুনকার পাক আর্মিদের সাথে নিয়ে আমার ছোট বোনকে তুলে নিয়ে যায়। পরের দিন বস্তাবন্দী ফাতেমার বিবস্ত্র ও বিক্ষিপ্ত লাশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সেই চান্দু খুনকার এখন মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় । আশ্চর্য বিষয় হলো, চান্দু খুনকারই আমাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং অতি অলৌকিক ঘটনা হলো—যার পুরো পরিবারকে আমি রক্ষা করেছিলাম সেই গিয়াস আমার বিরুদ্ধে খুন ও ধর্ষণের অভিযোগের সাক্ষী দিয়েছে । জজ সাহেব আমাকে জিগ্যেস করেছে আপনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য কী না—আমি চান্দু খুনকার আর গিয়াসের চোখের দিকে তাক করে বলেছি, সব সত্য । পৃথিবীতে যত খুন ও ধর্ষণ হয়েছে—সব আমি একাই করেছি ।

যদিও প্রচণ্ড ঘৃণা আর অভিমান থেকে আমি বলেছি ‘সত্য’ তবে অভিযোগ অস্বীকার করলেও রায়ের কোনও পরিবর্তন হতো না। রায়, জজ সাহেব আগে থেকেই লিখে নিয়ে আসছে। পাক আর্মিদের নারী সাপ্লাই দেওয়া চান্দু খুনকার যদি আমাকে রাজাকারের খেতাব দেয়, সেখানে আমার সত্য-মিথ্যা দিয়ে আর কীই-বা হবে বলো ?    

বাস্তবতা আমি মেনে নিয়েছি। আমার হাতে বেশি সময় নেই। তোমাকে অভাব, অনটন আর অভিযোগ ছাড়া আমি কিছু দিতে পারি নি। আমাকে ক্ষমা ভিক্ষা দিও। মার কথা একটু বেশি মনে পড়ছে। তার ছেলের ফাঁসি ! মা এটা কীভাবে মেনে নিবে ? এসব ভেবে আমার মাথা ক্রমশ নত হয়ে আসছে । তুমি বিয়ে করার পর আমার মাকে তোমার সাথে রেখো। এটা আমার আদেশ ।

আমার একটা মাত্র মেয়ের জন্যও কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। ব্যাপারটা দুঃখজনক। আমার টাকাপয়সা নেই। আমার মূলধন ছিল সততা। সেটিও বিক্রি হয়ে গেলো। সবাইকে তুমি দায়িত্ব নিয়ে বলো—আমি মান্নান, যুদ্ধাপরাধী নই। আমার বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা অভিযোগকে সত্য বলা ছাড়া আমি জীবনে একটা মিথ্যা কথাও বলি নি। খুন তো দূরের কথা আমি জীবনে কাউকে একটা চড়-থাপ্পড়ও দেইনি। ধর্ষণের অপবাদটা আমাকে আলাদাভাবে ব্যথিত করে তুলছে। খাদিজা তুমি তো ভালো করেই জানো, মেয়ে মানুষ দেখলে আমি মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতাম। সেই আমাকেই।

১০ ফুট বাই ৬ ফুটের এই কনডেমড সেলে থাকতে থাকতে কেমন যেন আমি প্রতিবন্ধীর মতো হয়ে গেছি। ফাঁসিতে ঝুলে পড়াটাই এই মুহূর্তে আমার কাঙ্খিত জয়ের সমান। জীবন, বেঁচে থাকা, নির্মোহ মমতা—কোনও কিছুকেই আমার আর নিজের বলে মনে হচ্ছে না। কেবল আসন্ন মৃত্যুকেই মনে হচ্ছে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি ।

তোমার মান্নান  

মুহাম্মাদ ইমরান

৮ ৯ ২৬

কারাগার | মুহাম্মাদ ইমরানের কবিতা | Karagar | Muhammad Imran |

kobi imran.muhammad imran,

কারাগার

সদ্যই কেবল তাঁহার কথা মনে পড়ে
কী দিবস, কী রজনী, কী পড়ন্ত বৈকাল
সে যেন জড়ায়ে ধরিয়াছে
মোর সকল খেয়াল ।

চেতনার সকল রন্ধ্রে
কতবার তালা লাগাইলাম—
প্রাপ্তি হিসাবে জুটিলো কেবল
অসহায় কতক রাত
আর ধূলিমাখা পিচ্ছিল আর্তনাদ।

বাঁচিয়া থাকার অমোঘ শখ
তাঁহাকে প্রায়শই
ভুলাইয়া দেয় কিন্তু
তাঁর নিষ্পাপ মুখখানির নিকট
বাঁচিয়া থাকার আকুতি
যখন অতীব নগণ্য
হইয়া দাঁড়ায়
তখন আর কী’ই বা করার ?

এক কাকডাকা ভোরে
তাঁহার একখানি কথা’ কলিজাটা
উতলাইয়া দিয়াছিল—
‘বুঝবি আমি না থাকলে বুঝবি’ !

আমি ঢের বুঝিয়াছি,
তোর প্রত্যাশার চাইতে
অনেক অনেক বেশি  ?
তুই হয়তো জানিস না
মানুষের স্বভাব
কখনো বদলায় না ।

মানুষ নামটাই কেবল
আমাদের মহান করেছে;
ভেতরটা স্বার্থপরতা,
প্রবৃত্তিগত দায়, ক্ষমতা, কাম
আর নানান রকমের
লোভের চাদরে মোড়ানো ।

তোর কত অশ্রু, আর্তনাদ,
ছোট্ট একটি সংসারের স্বাভাবিক স্বপ্ন 
আমার কাছে অতীব যতনে জমা করা আছে
যদি পারিস, স্বপ্নগুলো ফেরত নিস ।

০৭ ০১ ১৫

গতকাল | মুহাম্মাদ ইমরানের কবিতা | Gotokal | Muhammad Imran |

kobi imran.muhammad imran,

স্বপ্নের রোষানলে
পড়েছিলাম গতকাল
ভুলে যাওয়া সুখ দেখলাম
অনাদিকালের পর ।

এসেছিল পরান মাঝে
এসেছিলে ব্যথাতুর আঙিনা জুড়ে
চৌদিকে কেবল
তৃপ্তি আর প্রাপ্তির লড়াই
কমেনি তোমার হাসির দাপট
রূপের অসম বড়াই ।

ময়না আমার, লক্ষ্মী আমার, জান আমার’
আরও কিছুক্ষণ থাকলে কী হতো না
আদতে আমার কোনো
সোনালি ঊষার অভিলাষ ছিল না ।

চাই না গাঁটছড়া !
অনগ্ন, অধুনা সুখের পালকির
কোনো কাহার চাই না আমি ।
কালের আবর্তে, মহাকালের পরে
ভুলে ভুলে স্বপনে এসো তুমি ।

২৩ ১০ ১৬

রাজকন্যা | মুহাম্মাদ ইমরানের কবিতা | Rajkonna | Muhammad Imran |

kobi imran.muhammad imran,

কেমন আছ তুমি, রাজকন্যা ?
হৃদয়পুরের বাদশাহ আমার’
যার রক্তের মধ্যে তোমার বাস
যার সুখের মধ্যে তোমার চাষ
তুমিই বলো হে লক্ষ্মী
সে তোমার খবর না নিয়ে
থাকতে পারে ?
তোমার ভালো থাকাটা যে
তার বেঁচে থাকার ইন্দ্রজাল ।

আমি জানি, তুমি কেমন আছ
তা জানার যৎসামান্য অধিকার
আমি এবং আমার
সর্বান্তকরণ পরান গহীনের
আমিরও নেই’ ।
কষ্ট নিও না, অভিমান আর
অশ্রুকে গুলিয়ে ফেলো না ।
তাদেরকে তাদের কক্ষপথে
স্ব-স্ব দাপটে ঘুরতে দাও ।

বিশ্বাস কর পাগলি, প্রচণ্ড জানতে
ইচ্ছা করছে, তুঁই কেমন আছিস ?
ভালো আছ তো, সুখে আছ তো ?
শান্তি, শান্তি আসে তো
তোমার নকশিকাঁথার ভাঁজে !  

না কি আবার প্রহসনে মেতে আছ
না কী ঐ দূর আকাশে
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে
অদৃশ্যের মাঝে দৃশ্যমান কিছু
তালাশে ব্যতিব্যস্ত থাকো ।

কাম-বাসনায় হন্যে হয়ে ভিন্নতা
খুঁজে বেড়াও না তো আবার !
মিছেমিছি স্বামীর সাথে করো কী খেলা
দুর্দান্ত অভিনয়ে মাতো কী সারাবেলা
বালিশ-চাদরে মুখচেপে খুঁজো কী সান্ত্বনা ?
স্বামীর ফাঁদে’ আটকে পড়া মানুষটার
জোরজুলুমের সোহাগকে ভাবো না তো যন্ত্রণা ?

মনে আছে, সে আমায়
জান বলি ডাকিত’
কইলজের মধ্যে পুঁইতা রাইখ্যা
আমায় সে মাথার তাজ করি রাখিত ।   
যে আমার লাগি কাঁদিত ক্ষণে ক্ষণে
দেবে কী সে আর বলো  অন্য জনে ?

১৫ ১১ ১৬

ভালো নেই ও ! মুহাম্মাদ ইমরানের কবিতা | Valo Nei O | Muhammad Imran | 

kobi imran.muhammad imran,

আমাকে চোখে
আঙুল দিয়ে বুঝাতে হবে না
তুমি আমার নও !
জানি, আমি জানি, তুমি আমার নও।
আমি জানি, নিরুপমা এখন নিরুদ্দেশ।

তুমি এখন আষাঢ়ের ভুতুড়ে কোনো গল্প
আমি জানি, তুমি এখন পরিত্যক্ত রায়-বাড়ির
গুমোট, ধ্রুপদী আওয়াজের তোপধ্বনি মাত্র ।

আকাশে-বাতাসে
এক শ হাত মাটির নিচে
বাঁশের ঝাড়ে, ভুতুম প্যাঁচার
অপ্রস্তুত ঘন ঘন ডাকে
বুকের মাঝে ধপাৎ করে ওঠার সংকেতে
রোদেলা দুপুরের বটের প্রশান্তিতে
বাচ্চা ছেলেটার প্রথম
মা বলে ওঠার আকুতিতে
নিঃশ্বাসে, বিশ্বাসে কোথাও
তোমার অস্তিত্বের গন্ধও নেই ।

এমনকি কল্পনাতেও তোমার ছবি অস্পষ্ট
ঝাপসা একখানা অবয়ব অপলক দৃষ্টিতে
মাঝে মাঝেই কী  যেন একটা প্রশ্ন করে ?
যদিও তাঁর  প্রশ্নটা স্পষ্ট নয়
তারপরও উত্তর দেওয়ার দুঃসাহস
দেখানো হয়নি কখনো।

এইতো গত পরশু
নীলাভ এক বিকেলকে সাহস করে
ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেম—
ওর কোনো খবর তোমার কাছে আছে,
কেমন আছে ও ?
জিজ্ঞেস করতেই বিকেলের আবহে
মুখখানা ভারী করে
সন্ধ্যা নেমে এলো
বুঝলাম ও ভালো নেই ।

২০ ৯ ১৫

বড় সাধ ছিল | মুহাম্মাদ ইমরানের কবিতা | Boro Sadh Chilo | Muhammad Imran |

বড় সাধ ছিল তোমার স্পর্শে
জীবনের মানে বোঝার;
সাধ ছিল তোমার কবুল বলার ভঙ্গিটা দেখার ।

সাধ ছিল চাঁদকে সাথে নিয়ে
সারারাত ডিঙ্গি নৌকায় ঘুরে ফেরার,
জ্যোৎস্নার আলোকে জিম্মি করে
মুদ্রাহীন ছন্দের তালে তালে ঢলাঢলি করার ।

সাধ ছিল পুরোদস্তুর স্বপ্নাতুর বনে যাবার
অধরা স্বপ্নের খুব কাছাকাছি চলে যাবার ।
সাধ ছিল ভালোবাসাকে চেটেপুটে খাওয়ার,
আকস্মিক চুম্বনে
তোমার ঘর্মাক্ত লালা শুষে নেওয়ার ।

সাধ ছিল একটি সন্তান, কন্যা সন্তান;
দেখতে তোমার মতো
হবে, আমার অনুভূতির মাস্তান ।
সাধ ছিল তোমার মুখ থেকে ঘন ঘন
‘এই শুনছো’ শুনার।

উচ্চাভিলাষী বিরামহীন ঝগড়া শেষে
দুজন দু’কাত হয়ে ঘুমের ভান করে
সারানিশি চোখ বড় করে চেয়ে থাকার ।

একটি দোতলা বাড়ি, একটি ছোট সংসার
দুজন মিলে একটি জীবন, আবহ চমৎকার ।
বড় সাধ ছিল শিশুতোষ ভালোবাসায়
তোমাকে আগলে রাখার,
নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়ে
তোমাকে নির্মাণ করার।


১৭ ১০ ১৬

আমি কোনো সংবিধান মানি না | মুহাম্মাদ ইমরানের কবিতা | Ami Kono Sonhbidhan Mani na | Muhammad Imran |

আমার কাছে পৃথিবীর
কোনো মানে নেই।
আমার কাছে জীবনের
আলাদা কোনো ভাষা নেই ।
স্বাদ নেই, স্বস্তি নেই, শাস্তি নেই,
শ্রান্তি নেই, তিক্ততা নেই,
ক্লেদ নেই, নেই কোনো প্রাপ্তি ।
সমস্ত নতি স্বীকারের মধ্যে এখনো
আমি তোমাকেই খুঁজি
পৃথিবীর মানে বলতে এখনো
আমি তোমাকেই বুঝি ।

আমি কোনো সংবিধান মানি না।
আমি প্রেসিডেন্ট মানি না
আমি কোনো প্রধানমন্ত্রী মানি না
মন্ত্রীমশাইদের একের পর এক
বিরল প্রজাতির আশ্বাস মানি না।
সেনাবাহিনীর তাণ্ডব অথবা
অভিবাদনের নামে ফুলেল শুভেচ্ছা,
ভয়ার্ত চিৎকারে গার্ড অব অনার
বিলকুল তাড়িত করেনা আমায় ।

রাষ্ট্রযন্ত্র বিকল করে ক্ষমতায়
বসে থাকার পশুবৃত্তি’ মানি না আমি ।
মানি না ৫৪ ধারা, পুলিশি নির্যাতন ।
শক্ত বিধান এবং শক্তিশালী মানুষ
সব মূল্যহীন, কিছুই মানি না আমি।

আমি সংসদ মানি না, সাংসদ মানি না,
ন্যায়-নীতি, নিষ্ঠা, বিনয়াবনতা, সততার
চার পয়সার দাম নেই আমার কাছে ।
তোমার মূল্যেই কেবল ওরা আমার কাছে
মূল্যবান অথবা মূল্যহীন, প্রিয়তমা ।
,
ধুরন্ধর গোধূলির স্পষ্ট অস্পষ্টতা
আমার গতরে জ্বালা ধরাতে পারে না ।
হলুদ নদীর আদৌ সাহস নেই
আমাকে চুম্বনের, আমাকে ছোঁয়ার ।
বাঁচা-মরার ধুন্ধুমার কোনো
ভিন্নতা নেই আমার কাছে ।
আলো-আঁধারের ব্যবধান কোথায়
আমি বুঝি না, জানি না ।

আমি স্বপ্ন দেখি না, দেখতে পারি না।
তুমিহীন সব স্বপ্নই আমার কাছে
মিথ্যাচার, দুঃস্বপ্ন, স্বপ্নবিলাস,
প্রলয়ঙ্কারি পাপাচার, ব্যভিচার ।

রীতিনীতি, কাল-মহাকাল,
আদিম যুগ, স্বর্ণ যুগ, কলি যুগের
সাধ্য নেই আমাকে পরাভূত করার;
আমার সাথে সখ্যতা গড়ে তোলার ।

আমি সুখ নামের বহুমাত্রিক অসুখকে
বুট দিয়ে পিষ্ট করে লাথি মেরে
ভারত মহাসাগরে ফেলে দেই ।
আমি অশ্রুর সফেনকে বুড়ো আঙুল
দেখিয়ে সারারাত অব্দি তোমার
ফিরে আসার প্রহর গুনতে থাকি ।
আমার ধুম্রজালে ভরা খেয়ালকে
বারংবার শুশ্রূষা করি, কেবল
তোমার জন্য, সুহাসিনী রাজকন্যা ।

অনন্যোপায় এই ধরায় কোনোদিনই
ফুটবে না হয়ত আশার বকুল ।
তবুও সকল অনুবিধি, অনুমত
অনুদঘাত, অনুপপত্তি আমার কাছে
নির্ভেজাল, বেমালুম উপেক্ষিত ।

যাপিত সমাজ ব্যবস্থা, যুতসই শাস্ত্রসকল
এবং মনুষ্যরচিত সংবিধানে
তুমি বিচার্য নও লক্ষ্মীসোনা !
প্রিয়তমা, আহ্লাদী ময়না,
তোমাকে সালাম, সালাম নিরন্তর ।


১৮ 0৯ ১৬

একদিন | মুহাম্মাদ ইমরানের কবিতা | Ekdin | Muhammad Imran |

স্বপ্নের নীলাভ চাদর
একদিন আমার
গতরেও জড়ানো ছিল ।

ঠিকমতো স্বপ্ন দেখতে পারতাম না
স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার ভয়ে।
আলো-আঁধারের বিন্দুমাত্র ব্যবধান
আমিও টের পাইনি।

আমার ছোট পৃথিবী থেকে
তাঁকে বাদ দেওয়া হলে
আমার অবশিষ্ট কিছু
থাকত কী না
ভেবে দেখা হয়নি কখনো।।

কী ভেবে মন খারাপ করি ?
এ যে ভীষণ ভুল
আদালত অবমাননার শামিল ।

চরম, ভয়ংকর ঔদ্ধত্য আমার
কী করে ভাবি, কোত্থেকে এলো
এই মহা প্রলয়ঙ্কারি দুঃসাহস !
ভাবাটাই তো অন্যায়—
সে আজ নেই ।


২৬ ৬ ২০০৬

আবার যদি আসি ফিরে ? মুহাম্মাদ ইমরানের কবিতা | Abar Jodi Asi Fere | Muhammad Imran |

পড়বে আমায় মনে
কুয়াশার চাদরে ঢাকা
স্নিগ্ধ কোনো এক সকালে
অনেক কষ্টে গাছির
পেড়ে আনা খেজুরের রস
আর হুড়ুমের মিতালীতে ।

আমার ছায়া পাবে তুমি
শীতের প্রকম্পতায় টিকতে না পেরে
একটুখানি রোদ্দুরের খোঁজে বের হওয়া
চুরুটে বৃদ্ধার হাজারো নালিশ নিয়ে
নিষ্পলক আকশের দিকে তাকিয়ে থাকায় ।

আমি বারংবার ফিরে আসব
তোমার উদাস দুপুরের
ঘর্মাক্ত ঝগড়াঝাঁটির
ভাবলেশহীন নীরস ব্যস্ততায়।

আমার হাতছানি কাঁদাবে তোমায়
সেই যে যুদ্ধে যাওয়া সন্তানের মায়ের
শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুধারার সহস্র দেনা
শোধরানোর নীরব তাড়নায় ।
,
ধরো যদি আবার আসি ফিরে
তোমার যাপিত বোবা তাড়নার
রুগ্ন চাহুনির অবুঝ ভাষাতে অথবা
মাঝ দরিয়ায় হারিয়ে যাওয়া
স্বামীকে ফিরে পাওয়া কৃষাণীর
বাঁধভাঙ্গা উল্লাসের
সুহাসিনী মুখরতা জুড়ে ।

আমায় খুঁজে পাবে তুমি
বিকেলের অনিন্দ্যসুন্দর সবুজ মাঠে
খেলায় মগ্ন যুবকের চোখের বাটে,
গোধূলির বিষণ্ণ বেলায় বিধ্বস্ত
প্রেমিকের অসহায় আত্মসমর্পণে।

তোমার অস্তিত্বের নাম না জানা সকল স্তরে
ঘন ঘন নিঃশ্বাসের পরশ বুলিয়ে দেবো
তোমার রক্ত-মাংস, শিরা-উপশিরা
সমগ্র সত্তাগত দায়বদ্ধতায়
নির্ঝঞ্ঝাট মিলিয়ে যাবো ।

রাত-দুপুরে
ঘুমের প্রচণ্ডতায় হারিয়ে যাওয়া
কোনো এক ষোড়শী কন্যার
স্বপ্নের আবির মাখানো রঙের মেলায়
বেমালুম, বেখেয়ালে পাবে তুমি আমায় ।

তুমি কী আনমনে ভড়কে যাবে
নচেৎ থমকে ?
চার বেহারার পালকি আর
কলেমার ধ্বনিতে !

সত্যিই কী ফিরে আসা সম্ভব ?
সত্যিই কী কারো চলে যাওয়া
জ্যোৎস্নার মৃদু-স্নিগ্ধ আলোয়
পুকুরপাড়ে বসা নবদম্পতির
নয়নাভিরাম ঢলাঢলিতে
এতটুকু প্রভাব ফেলতে পারে ?

হয়তবা কোনোদিনই না
আবার হয়তবা হাঁ !
ফিরেও আসতে পারে
ফিরে আসার
নিদারুণ ব্যাকুলতায় !


২৬ ৬ ২০০৬